বাংলাদেশের কৃষক দেশের অর্থনীতির প্রাণ।
বাংলাদেশের কৃষক দেশের অর্থনীতি ও খাদ্যব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। কৃষকের পরিশ্রমে ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, শাকসবজি ও বিভিন্ন ধরনের ফসল উৎপাদিত হয়। দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণে কৃষকের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষক শুধু খাদ্য উৎপাদনই করে না কৃষিকে কেন্দ্র করে গ্রামীণ অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কৃষিপণ্য পরিবহন, সংরক্ষণ, বাজার জাতকরণ, প্রক্রিয়াজাতকরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের সাথে বহু মানুষের কর্মসংস্থান জড়িত। বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। বাংলাদেশের কৃষকরা জাতীয় অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি। কৃষকদের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই ধান, গম, ভুট্টা, পাট, সবজি, ফলমূল ও বিভিন্ন অর্থকরী ফসল উৎপাদিত হয়। যা দেশের মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণের পাশাপাশি অর্থনীতিতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল। নদীমাতৃক ও সুজলা সুফলা বাংলাদেশের আত্মশক্তি লুকিয়ে আছে কৃষকদের মাঝে। রোদ বৃষ্টি উপেক্ষা করে মাঠের পর মাঠ সোনা ফলানো এই মানুষগুলোই আমাদের বেচে থাকার প্রধান অবলম্বন। বাংলাদেশের কৃষক কেবল শস্য উৎপাদনকারী নন, তারা আমাদের সংস্কৃতি ও অর্থনীতির মূল ভিত্তি। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমেই আজ দেশ খাদ্যে সয়ংসম্পূর্ণ। বর্তমানে উন্নতজাতের বীজ, সেচব্যবস্থা, কৃষিযন্ত্র, আধুনিক প্রযুক্তি এবং কৃষি সম্প্রসারণ সেবার কারণে বাংলাদেশের কৃষিতে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে।
সরকার বিভিন্ন ভর্তুকি, কৃষিঋণ, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিগত সহায়তার মাধ্যমে কৃষকদের সাহায্য করছে। ফলে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষকের জীবনমান ধীরে ধীরে উন্নত হচ্ছে। বাংলাদেশের কৃষকরা প্রতিকূল আবহাওয়া, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, লবণাক্ততা, পোকামাকড়ের আক্রমণ এবং বাজারে ন্যায্য মূল্য না পাওয়ার মতো নানা সমস্যার মুখোমুখি হন। তবুও তারা অক্লান্ত পরিশ্রম করে কৃষি উৎপাদন অব্যাহত রাখেন। তাদের এই পরিশ্রম দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের কৃষক দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির অন্যতম ভিত্তি। তাদের পরিশ্রমের ফলেই দেশের মানুষ খাদ্য পায় এবং অর্থনীতি এগিয়ে যায়। কৃষকদের ন্যায্য মূল্য, সহজ ঋণ, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে কৃষি আরও শক্তিশালী হবে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই কৃষকদের ন্যায্য মূল্য, আধুনিক প্রযুক্তি, সহজ কৃষিঋণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা হলে বাংলাদেশের কৃষি আরও সমৃদ্ধ হবে এবং দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।
কৃষকের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
বাংলাদেশের ইতিহাস ও অর্থনীতির সাথে কৃষকের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলের মানুষের প্রধান জীবিকা ছিল কৃষি কাজ। উর্বর পলি মাটি, নদ নদী ও অনুকূল জলবায়ুর কারণে বাংলায়, ধান, গম, পাট, ডাল, তেলবীজসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ গড়ে ওঠে। কৃষকরা যুগের পর যুগ পরিশ্রম করে দেশের খাদ্য চাহিদা পূরণ করে আসছেন। কৃষি মানবসভ্যতার অন্যতম প্রাচীন পেশা। প্রায় ১০ থেকে ১২ হাজার বছর আগে মানুষ যখন শিকার ও খাদ্য সংগ্রহের জীবন ত্যাগ করে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করে তখনই কৃষির সূচনা হয়। খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যমে মানুষের জীবনযাত্রায় বড় পরিবর্তন আসে এবং সভ্যতার বিকাশ ত্বরান্বিত হয়। সেই সময় থেকেই কৃষক সমাজের একটি অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। আবহমানকাল থেকেই বাংলার সমাজ সংস্কৃতি কৃষিকে কেন্দ্র করে আবর্তিত। লাঙল, জোয়ার আর বলদ নিয়ে কৃষকের পথ চলা এদেশের ইতিহাসে প্রাচীনতম অধ্যায়। জমিদারি প্রথার শোষণ থেকে শুরু করে আধুনিক যুগের নানা প্রতিকূলতা পার করেও বাংলার কৃষক তাদের ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। মাটির সাথে তাদের এই সম্পর্ক বংশপরম্পরায় চলে আসছে আজও। ব্রিটিশ শাসনামলে ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত চালুর ফলে জমিদারি প্রথা চালু হয়। ফলে কৃষকদের ওপর খাজনার বোঝা বেড়ে যায় এবং অনেক কৃষক নির্যাতনের শিকার হন। এই সময় নীল চাষের জোরজবরদস্তির বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলন, বিশেষ করে নীল বিদ্রোহ বাংলার কৃষক সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে কৃষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রাচীনকাল থেকেই এ অঞ্চলের উর্বর মাটি ও নদীবিধৌত ভূপ্রকৃতি কৃষিকে সমৃদ্ধ করেছে। পাল, সেন ও সুলতানি আমলে কৃষিই ছিল অর্থনীতির মূল ভিত্তি। মুঘল আমলে কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি পেলেও কৃষকদের ওপর ভূমি করের চাপ ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কৃষি উন্নয়নে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করে। উন্নত বীজ, সেচ ব্যবস্থা, সার, কৃষিযন্ত্র এবং আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করেছে। বর্তমানে কৃষকরা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি খাতেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি
অক্লান্ত পরিশ্রমের জীবন
কৃষি প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ
সহজ সরল জীবনযাত্রা
আবহাওয়ার সাথে যুদ্ধ
উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার
বাংলাদেশের কৃষিতে উচ্চ ফলনশীল বীজের ব্যবহার উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এসব বীজ উপযুক্ত পরিবেশ ও সঠিক কৃষি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তুলনামূলকভাবে বেশি ফলন দিতে পারে। ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ও বিভিন্ন ফসলের উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করে কৃষক একই জমি থেকে অধিক উৎপাদন পাওয়ার সুযোগ পান। উচ্চ ফলনশীল বীজ আধুনিক কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। এই ধরেন বীজ ব্যবহার করলে একই পরিমাণ জমিতে তুলনামূলক বেশি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হয়। ফলে কৃষকের উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। আয় বাড়ে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষি বিজ্ঞানীদের উদ্ভাবিত উচ্চফলনশীল বীজ ও হাইব্রিড জাতের ব্যবহার কৃষকদের ভাগ্য বদলে দিয়েছে। অল্প জমিতে এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল জাতে বীজ ব্যবহার করে প্রতিকূল অঞ্চলেও কৃষকেরা সোনা ফলাচ্ছেন। এটি আমাদের কৃষি বিপ্লবের অন্যতম প্রধান চাবিকাটি। উচ্চফলনশীল বীজের মাধ্যমে ধান, গম, ভুট্টা, সবজি ও অন্যান্য ফসলের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা যায়। অনেক উন্নতজাতের বীজ রোগবালাই ও কিছু প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করার ক্ষমতাও রাখে। তবে এসব বীজ থেকে সর্বোচ্চ ফলন পেতে সময়মতো বপন, সুষম সার প্রয়োগ, সঠিক সেচ ব্যবস্থা এবং নিয়মিত পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হয়। উচ্চ ফলনশীল বীজ ব্যবহারের ক্ষেত্রে কিছু বিষয়েও সতর্ক থাকতে হয়। মানসম্মত ও প্রত্যয়িত বীজ ব্যবহার করা, মাটির উর্বরতা বজায় রাখা এবং কৃষি বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি। এতে উৎপাদন ব্যয় কমে , ফলন বাড়ে এবং কৃষি আরও টেকসই হয়। উচ্চফলনশীল বীজের সঠিক ব্যবহার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি, কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন এবং দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।
দেশের উন্নয়নে অবদান
বাংলাদেশের সামগ্রীক উন্নয়নে কৃষকের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের উৎপাদিত খাদ্য দেশের মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণে সহায়তা করে এবং কৃষিভিত্তিক বিভিন্ন শিল্পের জন্য কাচামাল সরবরাহ করে। কৃষিকে কেন্দ্র করে পরিবহন, বাজারজাতকরণ, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবসার মতো অনেক অর্থনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালিত হয়। কৃষি উৎপাদন বাড়লে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা শক্তিশালী হয় এবং কৃষিপণ্যের সরবরাহ স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি পাট, চা, শাকসবজি, ফলমূলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি রপ্তানিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
সবজি ও ফল চাষে সাফল্য
বাংলাদেশের কৃষিতে সবজি ও ফল চাষের গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক মাটি, আবহাওয়া ও মৌসুমের উপযোগী বিভিন্ন ধরনের সবজি ও ফল চাষ করে সাফল্য অর্জন করছেন। আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, উন্নত জাতের বীজ ও চারা, সেচব্যবস্থা এবং কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সবজি ও ফল চাষ বাংলাদেশের কৃষিতে এক নতুন সম্ভাবণার দ্বার উন্মোচন করেছে। আধুনিক প্রযুক্তি উন্নত জাতের বীজ, সঠিক পরিচর্যা এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করে অনেক কৃষক সফলভাবে সবজি ও ফল উৎপাদন করছেন। এর ফলে শুধু নিজের আর্থিক অবস্থার উন্নতি হচ্ছে না, দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তাও নিশ্চিত হচ্ছে। শুধু ধান বা গম নয়, সবজি ও ফল উৎপাদনেও বাংলাদেশের কৃষকেরা অভূতপূর্ব সাফল্য দেখিয়েছেন। বারোমাসি সবজি চাষের মাধ্যমে কৃষকরা দেশের পুষ্টির চাহিদা মেটাচ্ছেন। আম, কাঠাঁল ও লিচুর মতো মৌসুমি ফল চাষ করে অনেক কৃষক এখন স্বাবলম্বী। দেশের চাহিদা মিটিয়ে এই সবজি ও ফল এখন বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। সবজি ও ফল চাষে সফল হতে উন্নতমানের বীজ ব্যবহার , সুষম সার প্রয়োগ, সঠিক সেচ ব্যবস্থা, রোগ পোকা দমন, জৈব সার ব্যবহার এবং আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি উৎপাদিত ফসলের সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা উন্নত হলে কৃষক আরও বেশি লাভবান হন। বর্তমানে টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, বাধাঁকপি, শসা, মরিচ, লাউ, কুমরা, করলা, সিমসহ বিভিন্ন সবজি এবং আম, কলা, পেয়ারা, লিচু, পেপে, ড্রাগনফল, মাল্টা ও লেবুর মতো ফলের চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সারাবছর পরিকল্পিতভাবে এসব ফসল উৎপাদনের মাধ্যমে কৃষকের আয় বাড়ছে এবং নতুন কাজের জায়গার সুযোগ বাড়ছে। সবজি ও ফল চাষের এই সাফল্য আরও সমৃদ্ধ করছে। অনেক কৃষক বাণিজ্যিকভাবে ফল ও সবজি চাষ করে নিজেদের আয় বৃদ্ধির সুযোগ তৈরি করছেন।
ঋণ ও পুজির সমস্যা
বাংলাদেশের অনেক কৃষক কৃষিকাজ পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত পুজি সংকটে ভোগেন। জমি প্রস্তুত করা, বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ, কৃষিযন্ত্র ও শ্রমিকের খরচ মেটাতে মৌসুমের শুরুতেই বড় অঙ্কের অর্থের প্রয়োজন হয়। কিন্তু অনেক কৃষকের হাতে পর্যাপ্ত সঞ্চয় না থাকায় তারা ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নানা জটিলতা, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, জামানত এবং ঋণপ্রাপ্তিতে সময় লাগার কারণে কিছু কৃষক সমস্যায় পড়তে পারেন। ঋণ ও পুজির অভাব বাংলাদেশের কৃষকদের অন্যতম প্রধান সমস্যা। অনেক কৃষকের পর্যাপ্ত নিজস্ব মূলধন না থাকায় তারা উন্নত বীজ, সার, কীটনাশক, সেচব্যবস্থা বা আধুনিক কৃষিযন্ত্র কিনতে পারেন না। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং কাঙ্খিত ফলন পাওয়া যায় না। এত অবদানের পরও বাংলাদেশের কৃষকেরা প্রায়ই পুজির সংকটে ভোগেন। ফসল বোনার মৌসুমে দাদন ব্যবসায়ী বা চড়া সুদের মহাজনদের কাছ থেকে তাদের ঋণ নিতে হয়। অনেক সময় ব্যাংক ঋণের জটিল প্রক্রিয়ার কারণে সাধারণ কৃষকেরা সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হন। অনেক সময় কৃষকরা প্রয়োজনীয় অর্থের জন্য বেসরকারি ঋণদাতার কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হন। এতে উৎপাদন খরচ বেড়ে যায় এবং ফসল বিক্রির পরও ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে তারা আর্থিক সংকটে পড়েন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা বাজারে কম দামের কারণে ক্ষতি হলে এই সমস্যা আরও তীব্র হয়ে ওঠে। এই অর্থনৈতিক শৃঙ্খল তাদের জীবনের এক বড় অভিশাপ। এই সমস্যা সমাধানে কৃষকদের সহজ শর্তে ও স্বল্প সুদে কৃষিঋণ প্রদান, ঋণ বিতরণ প্রক্রিয়া সহজ করা, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের জন্য বিশেষ আর্থিক সহায়তা নিশ্চিত করা এবং কৃষি বীমার ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন। পাশাপাশি কৃষকদের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা এবং সরকারি ও বেসরকারি সহায়তা বৃদ্ধি করলে ঋণ ও পুজির সংকট অনেকটাই কমানো সম্ভব হবে।
ফসলের ন্যায্যমূল্যের অভাব
বাংলাদেশের কৃষকদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া।একজন কৃষককে জমি প্রস্তুত করা থেকে শুরু করে বীজ, সার, সেচ, কীটনাশক, শ্রমিক ও পরিবহণসহ বিভিন্ন খাতে অর্থ ব্যয় করতে হয়। দীর্ঘ সময় পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদনের পর বাজারে যদি সেই ফসলের উপযুক্ত দাম না পাওয়া যায় তাহলে কৃষকের প্রত্যাশিত আয় হয় না। ফলে কৃষকের আর্থিক সংকট আরও বেড়ে যেতে পারে। ফসলের ন্যায্যমূল্য না পাওয়া বাংলাদেশের কৃষকদের অন্যতম বড় সমস্যা। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম করে ফসল উৎপাদন করলেও অনেক কৃষক উৎপাদন খরচের তুলনায় খুব কম দাম পান। এর কারণে কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন আর কৃষিকাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন। কৃষকের সবচেয়ে বড় দুঃখ হলো হাড়ভাঙা খাটুনি দিয়ে ফসল ফলিয়েও অনেক সময় তারা ন্যায্যমূল্য পান না। মধ্যস্বত্বভোগী বা ফড়িয়াদের কারণে বাজারের আসল মুনাফা কৃষকের পকেটে ঢোকে না। বাম্পার ফলন হলেও সঠিক দাম না পেয়ে অনেক সময় কৃষকদের লোকসান গনতে হয়, যা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রধান কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম, সংরক্ষণাগারের অভাব, বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতা, পরিবহন সমস্যা এবং বাজারদর সম্পর্কে সঠিক তথ্যের অভাব। ফসল তোলার মৌসুমে একসঙ্গে বেশি পরিমাণে বাজারে ফসল আসায় দাম কমে যায়। বাধ্য হয়ে কৃষক কম দামে ফসল বিক্রি করেন। এর ফলে কৃষক ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়েন, পরিবারের চাহিদা পূরণ করতে কষ্ট হয় এবং অনেকেই কৃষি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য হন। দীর্ঘমেয়াদে দেশের খাদ্য উৎপাদন ও কৃষি অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই সমস্যা সমাধানে কৃষকদের জন্য ন্যূনতম সহায়ক মূল্য নির্ধারণ, সরকারি পর্যায়ে সরাসরি ফসল ক্রয়, আধুনিক সংরক্ষণাগার নির্মাণ, বাজার ব্যবস্থা উন্নয়ন নিশ্চিত করা জরুরি।
সরকারি নানা সুযোগ সুবিধা
বাংলাদেশের কৃষকদের কৃষিকাজে সহায়তা করার জন্য সরকার বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে থাকে। কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো এবং কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি করার ক্ষেত্রে এসব সহায়তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষকদের জন্য বিভিন্ন কৃষি উপকরণে সহায়তা, উন্নতমানের বীজ সরবরাহ, সেচ সুবিধা, কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে সহায়তা এবং সহজ শর্তে কৃষিঋণের ব্যবস্থা করা হয়। পাশাপাশি কৃষি সম্প্রসারণ কার্যক্রমের মাধ্যমে কৃষকদের আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতি, রোগবালাই নিয়ন্ত্রণ, সার ব্যবস্থাপনা ও উন্নত জাতের ফসল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ দেওয়া হয়। কৃষির উন্নয়ন এবং কৃষকের জীবনমান উন্নত করতে সরকার বিভিন্ন ধরনের সুযোগ সুবিধা প্রদান করে থাকে। বর্তমান সরকার কৃষকদের কল্যাণে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। বিনামূল্যে ১০ টাকায় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা, কৃষি কার্ডের মাধ্যমে সার ও বীজে ভর্তুকি প্রদান এবং সুলভ মূল্যে কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহ করা হচ্ছে। সরকারি এই সহায়তার ফলে প্রান্তিক কৃষকেরা অত্যন্ত উপকৃত হচ্ছেন এবং চাষাবাদে নতুন করে উৎসাহ এবং উদ্দীপনা পাচ্ছেন। সরকারি সুযোগ সুবিধার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো কৃষি উপকরণ, সার, উন্নতমানের বীজ ও সেচে ভর্তুকি প্রদান। কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আধুনিক চাষাবাদের প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ প্রদান। কৃষকদের জন্য স্বল্প সুদে কৃষিঋণের ব্যবস্থা।প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য প্রণোদনা, বীজ ও সার বিতরণ। বিভিন্ন কৃষিযন্ত্র ক্রয়ে ভর্তুকি ও আর্থিক সহায়তা। গবেষণার মাধ্যমে উচ্চ ফলনশীল ও জলবায়ু সহনশীল জাত উদ্ভাবন এবং কৃষকের কাছে পৌছে দেওয়া। কৃষি তথ্য ও আবহাওয়া সংক্রান্ত পরামর্শ মোবাইল ও ডিজিটাল সেবার মাধ্যমে প্রদান। কৃষি পণ্যের উৎপাদন ও বিপণনে সহায়তা এবং কিছু ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয় কার্যক্রম।
কৃষকের প্রতি আমাদের দায়িত্ব
কৃষক দেশের মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করেন। তাদের প্রতি আমাদেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। কৃষকের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা, তাদের সাথে ন্যায্য ও সম্মানজনক আচরণ করা এবং কৃষি পণ্যের অপচয় রোধ করা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কৃষকের পরিশ্রমের প্রতি সম্মান দেখানোর পাশাপাশি তাদের উৎপাদিত পণ্য ন্যায্য দামে কেনার চেষ্টা করা উচিত। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, কৃষি প্রশিক্ষণ ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার সুযোগ তৈরি করতেও সমাজের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখতে পারে। কৃষক আমাদের খাদ্যের যোগানদাতা। তাদের কঠোর পরিশ্রমের ফলেই দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ হয়। কৃষকের প্রতি আমাদের সম্মান, সহযোগিতা ও দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। কৃষকেরা আমাদের অন্নদাতা, তাই তাদের প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা অপরীসিম । সমাজ ও রাষ্ট্রে তাদের যথাযথ সম্মান ও সামজিক মর্যাদা দিতে হবে। কৃষি পণ্যের বাজারজাতকরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম বন্ধ করতে হবে। কৃষকের মুখে হাসি থাকলেই সচল থাকবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ, সুরক্ষিত থাকবে আমাদের দেশের ভবিষ্যত। আমাদের উচিত কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সচেতন থাকা এবং অপ্রয়োজনীয় মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম কমাতে সহায়তা করা। কৃষিপণ্য অপচয় না করে দেশীয় কৃষিপণ্য ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া। কৃষকের পরিশ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন করাও আমাদের দায়িত্ব। এছাড়াও কৃষকের আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি, উন্নত বীজ, সেচ ব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ সম্পর্কে সচেতন করতে সমাজের শিক্ষিত মানুষ ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাড়ানো এবং তাদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়াও মানবিক দায়িত্ব। কৃষকের উন্নতি মানেই দেশের উন্নতি। তাই কৃষকের অধিকার রক্ষা, মর্যাদা বৃদ্ধি এবং তাদের কল্যাণে কাজ করা আমাদের সবার নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব।
বাংলাদেশের কৃষক দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা ও গ্রামীণ জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করে তারা জমিতে ফসল ফলান এবং দেশের কোটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণে অবদান রাখেন। প্রখর রোদ, বৃষ্টি, শীত, বন্যা, খরা, ঝড় কিংবা বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ কোনো প্রতিকূলতাই তাদের পরিশ্রমকে পুরোপুরি থামিয়ে দিতে পারে না। নিজেদের নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও তারা নতুন আশায় বারবার কৃষিকাজে ফিরে আসেন। কৃষকের উৎপাদনের ওপর শুধু মানুষের খাদ্য চাহিদাই নয় কৃষিভিত্তিক বহু ব্যবসা ও শিল্পও নির্ভরশীল। সবজি, ফল, ধান, পাট, মাছ ও অন্যান্য কৃষিপণ্য দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে সচল রাখে এবং কিছু পণ্য রপ্তানির মাধ্যমেও অর্থনীতিতেও অবদান রাখে। দেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সাথে কৃষকের জীবন ও কর্মের সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। কৃষকের জীবনকে আরও নিরাপদ ও সমৃদ্ধ করতে ন্যায্যমূল্য, সহজ কৃষিঋণ, উন্নত বীজ, আধুনিক কৃষিযন্ত্র, সেচব্যবস্থা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত পরামর্শ, ফসল সংরক্ষণ ও উন্নত বাজার ব্যবস্থা প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের যথা সময়ে সহায়তা দেওয়া জরুরি। অবশেষে বলা যায়, কৃষক বাচলে কৃষি বাচবে, কৃষি বাচলে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক কর্মকান্ড শক্তিশালী হবে।