বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে আধুনিক কৃষির রূপান্তর।

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অপরিসীম। আধুনিক বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে কৃষিকাজে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আগে কৃষকরা মূলত প্রচলিত পদ্ধতি ও প্রাকৃতিক আবহাওয়ার ওপর নির্ভর করতেন। বর্তমানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সাহায্যে কম সময়ে, কম খরচে এবং তুলনামূলকভাবে বেশি উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।  আধুনিক যুগ বিজ্ঞানের যুগ। মানুষ আল্লাহর দেওয়া জ্ঞান কাজে লাগিয়ে নিত্য নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে সভ্যতার চরম উন্নয়ন সাধন করেছে। সভ্যতার উষালগ্নে মানুষ যেদিন মাটিতে বীজ বুনে ফল ও ফসল ফলাতে শুরু করল, সেদিন থেকেই ফসল উৎপাদনের কাজে নতুন পন্থার উদ্ভাবন হলো। শুরু হলো কৃষিকাজে বিজ্ঞানের প্রয়োগ । ফলে বিশ্বের জনসংখ্যার পাশাপাশি ফসল উৎপাদনের পরিমাণও বৃদ্ধি পেয়েছে। কৃষি মানুষের আদিম পেশা। কৃষি কাজের মধ্য দিয়েই যাত্রা শুরু মানব সভ্যতার । সভ্যতার অগ্রযাত্রায় বিভিন্ন স্তরে মানুষ বিভিন্ন পেশা গ্রহণ করলেও খাদ্যের উৎস হিসেবে কৃষির ভূমিকা আজও গৌরবময়। দার্শনিক রুশো বলেন, সবচেয়ে বড় এবং  সর্বাধিক গৌরবমন্ডিত শিল্প হচ্ছে কৃষি। কৃষি ও মানব জীবন ওৎপ্রোতভাবে জড়িত। মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার শ্রেষ্ঠ চাবিকাঠি হচ্ছে কৃষি।

মানুষের হৃদপিন্ড থেকে রক্ত সঞ্চারিত হয়ে যেমন দেহ যন্ত্রকে সবল  ও সচল রাখে, কৃষিও তেমনি মানুষকে যোগান দিয়ে থাকে বেঁচে থাকার অপরিহার্য  উপকরণ সামগ্রী। যেদিন থেকে মানুষ আগুন জ্বালাতে শেখে, যেদিন সে পাথরের অস্ত্র নিয়ে বন্য পশুর সঙ্গে যুদ্ধ আরম্ভ করেছে, সেদিন সে চাকা গড়তে পেরেছেন, সেদিন থেকেই বিজ্ঞানের জয়যাত্রা শুরু হয়েছে। সেদিন মানুষ আবিষ্কার করল অন্যান্য প্রাণীর তুলনায় তার ক্ষুদ্র অবয়বে সূক্ষ্ম  অথচ প্রবল বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন মস্তিষ্ক । সে প্রকৃতির  রহস্য ভেদ করার জন্য নব নব তথ্য আবিষ্কার করল। প্রকৃতিকে আবিষ্কার করার নেশায় অস্তির হয়ে উঠল। কিছুতেই তার তৃপ্তি নেই। তাই প্রকৃতির দেয়া শস্য সম্পদে সে সন্তুষ্ট থাকতে পারেনি। আধুনিক কৃষিবিদ্যা রপ্ত করে নিজের রুচির পরিতৃপ্তি পরিপুষ্টি সাধন করেছে। কৃষির উন্নয়ন ছাড়া বাংলাদেশের সামগ্রিক উন্নয়ন সম্ভব নয়। কৃষকদের বিজ্ঞানভিত্তিক জ্ঞান ও আধুৃনিক প্রযুক্তির সাথে সম্পৃক্ত করতে হবে। কৃষিতে বিজ্ঞানের ব্যবহার শুধু ফসল উৎপাদন বাড়ায় না, কৃষকের শ্রম ও খরচ কমায়, ফসলের মান উন্নত করে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় সাহায্য করে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।  

কৃষি ও কৃষিকাজ

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মানুষের খাদ্য, পোশাক ও বিভিন্ন  শিল্পের কাচামালের বড় একটি অংশ কৃষি থেকে আসে। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ কৃষির সাথে জড়িত।  কৃষি হলো মানুষের খাদ্য, বস্ত্র ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাচামাল উৎপাদনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। জমিতে ফসল চাষ, ফল, শাকসবজি, গবাদিপশু পালন, মাছ চাষ সবই কৃষির অন্তর্ভুক্ত। প্রাচীনকাল থেকে কৃষি মানুষের জীবন ও সভ্যতার ভিত্তি হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে  আসছে । কৃষিকাজ বলতে জমি প্রস্তুত করা, বীজ বপন, সেচ দেওয়া, সার প্রয়োগ, আগাছা দমন,ফসলের পরিচর্যা, পরিপক্ব ফসল সংগ্রহের সম্পূর্ণ  প্রক্রিয়াকে বেঝায়। বর্তমানে কৃষি কাজ শুধু প্রচলিত পদ্ধতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আধুনিক কৃষিযন্ত্র, উন্নত বীজ, বৈজ্ঞানিক সার ব্যবস্থাপনা, আধুনিক সেচব্যবস্থা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং কৃষি গবেষণার মাধ্যমে কৃষিকাজ অনেক সহজ ও উৎপাদনশীল হয়েছে।  আধুনিক যুগে ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, কম্বাইন হারভেস্টার কৃষিকাজকে আরও সহজ উৎপাদনশীল করেছে।  মাটি কর্ষণ করে  ফসলের সম্ভার ফলানোর প্রক্রিয়াটিই কৃষিকাজ নামে পরিচিত। কৃষি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দরিদ্র্য হ্রাস এবং  অর্থনৈতিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। আদিকালে মানুষ  অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে কৃষি কাজের উদ্ভাবন করে। প্রকৃতির দানকে নিজের শক্তি ও  সৃষ্টিক্ষমতায় রূপান্তর ঘটিয়ে সে গড়ে তুলেছে কৃষি ব্যবস্থা। কৃষির প্রথম উদ্দেশ্য মুখের আহার জুটানো হলেও পরবর্তীতে মানুষ শিল্প কাচামাল থেকে শুরু করে জীবনের সকল প্রকার উপকরণ কৃষি থেকে সংগ্রহ করতে শিখেছে। শিল্পযুগে এসে কৃষিক্ষেত্রেও মানুষ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও উপকরণের ব্যবহার করেছে। ফলে আজ ভোতা কর্ষণ সামগ্রী ও পশুশক্তির পরিবর্তে ব্যবহৃত হচ্ছে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি । ফলে আদিম এই পেশাটিতে আজ এসেছে বৈচিত্র ও গতির ছোয়া। 

কৃষিকাজের গুরুত্ব

কৃষিকাজ মানুষের জীবন ও সভ্যতার সাথে গভীরভাবে জড়িত। মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর অন্যতম হলো খাদ্য আর খাদ্যের প্রধান উৎস হলো কৃষি। বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশে কৃষিকাজের  গুরুত্ব আরও বেশি। কৃষকরা কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জমিতে ফসল ফলিয়ে দেশের মানুষের খাদ্য চাহিদা পূরণ করেন। কৃষিকাজ দিয়েই মানুষ পৃথিবীতে স্বপোষিত অর্থনৈতিক জীবনের সূত্রপাত করেছিল এই পৃথিবীতে এবং এখনো কৃষির ওপর নির্ভর করে মানবজীবনের ধারা বয়ে চলেছে। সারা বিশ্বের মানুষের খাদ্য,  শিক্ষা উপকরণ, গৃহ ও অবকাঠামোগত উপকরণের মূখ্য যোগানদাতা কৃষি। বিশ্বের মোট আয়ের ২৭ ভাগ আসে কৃষি থেকে। মানুষের প্রয়োজন বিবেচনা করে কৃসিক্ষেত্রে অনবরত গবেষণা চলছে এবং এর পরিণামে উন্নত দেশগুলো তাদের কৃষিক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধন করেছে। বেশি করে ফলন বাড়িয়ে উন্নত দেশ একদিকে যেমন নিজেদের অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ আনছে, তেমনি ঘাটতি দেশের জন্য প্রয়োজনীয় খাদ্য সরবরাহ করে মানবজাতিকে বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা করছে। কৃষিকাজের মাধ্যমে ধান, গম, আলু, ডাল, শাকসবজি, ফলমূলসহ নানা ধরনের  খাদ্য উৎপাদিত হয়। এসব খাদ্য মানুষের দৈনন্দিন  জীবনের প্রয়োজন মেটায়। দেশের অনেক মানুষ কৃষিকাজের সাথে সরাসরি যুক্ত। কৃষিখাত গ্রামীণ মানুষের কর্মসংস্থানের বড় উৎস। কৃষি দেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। কৃষিপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের মাধ্যমে দেশের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সচল থাকে। পাট, তুলা, আখ, চা, তামাকসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য শিল্পকারখানার কাচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কৃষির উন্নত হলে কৃষকের আয় বাড়ে এবং গ্রামীণ অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। ফলে দারিদ্র্য কমাতে কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কৃষিকাজকে কেন্দ্র করে বাজার, পরিবহন, গুদাম, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণসহ নানা ধরনের ব্যবসা গড়ে ওঠে। চা, পাট, সবজি, ফলসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। কৃষিকাজ শুধু ফসল উৎপাদনের কাজ নয় এটি মানুষের জীবন, অর্থনীতি এবং উন্নয়নের  সাথে জড়িত। কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করা, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তি পৌছে দেওয়া, প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা এবং কৃষির প্রতি তরুণদের আগ্রহী করে তোলা প্রয়োজন।   

কৃষি গবেষণায় বিজ্ঞান

কৃষি গবেষণায় বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে  নতুন প্রযুক্তি ও উন্নত জাতের ফসল উদ্ভাবন করা হয় যা কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। উন্নত ও ফলনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন করা হয়। মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে উপযুক্ত সার ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হয়। জৈবপ্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার করে কৃষি গবেষণাকে আরও কার্যকর করা হচ্ছে। রোগ ও পোকামাকর প্রতিরোধী বীজ তৈরি করা সম্ভব হয়। আধুনিক সেচ ব্যবস্থা ও কৃষিযন্ত্র উদ্ভাবনের মাধ্যমে কৃষিকাজ সহজ ও দ্রুত করা হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবেলায় সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন করা হয়। গবেষণার ফলাফল কৃষকদের কাছে পৌঁছে দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধি ও ফসলের গুণগত মান উন্নয়ন করা হয়। 

কৃষিকাজে বিজ্ঞানের প্রভাব 

একবিংশ শতাব্দীর এই ঊষালগ্নে বিশ্ববাসীর জীবনে বিজ্ঞান এতটাই প্রভাব ফেলেছে যে, বিজ্ঞান ছাড়া আজ মানবজীবনই  কল্পনা করা যায়না। কৃষি কাজে বিজ্ঞানের প্রয়োগে ফসল উৎপাদনে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। উন্নত বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তি প্রয়োগে আজ মরুভূমিও হয়ে উঠছে শস্যশ্যামল। অনুর্বর কঠিন ভূমিকে উর্বর করে তাকে করা হচ্ছে শস্যবর্তী। আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার কৃষি কাজকে সহজ ও অধিক ফলনশীল করেছে। কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি  এবং দেশের অনৈতিক  উন্নয়নে কৃষির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । এক সময় কৃষিকাজ সম্পূর্ণ ভাবে মানুষের শ্রম, পশুশক্তি এবং প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল ছিল। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে কৃষিকাজে অনেক পরিবর্তন এসেছে। আধুনিক বিজ্ঞান কৃষিকাজকে করেছে সহজ, উৎপাদনশীল ও লাভজনক। কৃষি কাজে বিজ্ঞানের গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবগুলো হলো- বিজ্ঞানীরা উচ্চফলনশীল ও রোগপ্রতিরোধী বীজ উদ্ভাবন করেছেন, যা উৎপাদন বৃদ্ধি করে। মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে কোন ফসলে কী ধরনের সার প্রয়োজন তা নির্ধারণ করা যায়, ফলে উৎপাদন বাড়ে। জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত ও পরিবেশ সহনশীল ফসলের জাত তৈরি করা যায়।বৈজ্ঞানিকভাবে তৈরি সার ও কীটনাশক ফসলের বৃদ্ধি এবং রোগ পোকা দমনে কার্যকর ভূমিকা রাখে।ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, সিড ড্রিল, হারভেস্টার ও থ্রেশারের মতো যন্ত্র কৃষিকাজকে দ্রুত ও শ্রম সাশ্রয়ী করেছে। ড্রিপ সেচ, স্প্রিংকলার সেচ এবং গভীর নলকূপের মাধ্যমে সঠিকভাবে পানি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে।  প্রযুক্তির মাধ্যমে আবহাওয়ার তথ্য জেনে কৃষকরা সঠিকসময়ে বপন, সেচ ও ফসল কাটার সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। আধুনিক গুদাম, শুকানোর প্রযুক্তি ও হিমাগারের মাধ্যমে কৃষিপণ্য দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায়। বিজ্ঞানীরা খরা, লবণাক্ততা, জলাবদ্ধতা ও অতিবৃষ্টির মতো প্রতিকূল পরিবেশ সহ্য করতে পারে এমন ফসলের জাত উদ্ভাবন করছেন। বিজ্ঞানের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, শ্রম ও সময়ের সাশ্রয় এবং উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব হচ্ছে।  

কৃষিকাজে বিজ্ঞানের প্রয়োজন

কৃষি বাংলাদেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জমির পরিমাণ কমে যাওয়া এবং খাদ্যের চাহিদা বাড়ার কারণে আধুনিক কৃষিতে বিজ্ঞানের ব্যবহার অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বিজ্ঞান কৃষিকাজকে সহজ ও উৎপাদনশীল করেছে। কৃষির উন্নয়ন ও খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানের অনেক প্রয়োজন রয়েছে। আধুনিক বিজ্ঞান কৃষিকাজকে আরও সহজ ও লাভজনক করেছে। উন্নত জাতের বীজ ও আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির মাধ্যমে বেশি ফলন পাওয়া যায়। মাটির কোন পুষ্টি উপাদান কতটুকু রয়েছে তা বিজ্ঞানসম্মত পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী  সার প্রয়োগ করা সম্ভব হয়। বিজ্ঞানসম্মত পদ্ধতিতে ফসলের রোগ ও ক্ষতিকর পোকামাকড় শনাক্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ফলে ফসলের ক্ষতি কমে। ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার, হারভেস্টারসহ বিভিন্ন কৃষি যন্ত্রের ব্যবহার দ্রুত কৃষিকাজ সম্পন্ন করতে সাহায্য করে। বৈজ্ঞানিকভাবে তৈরি কীটনাশক, বালাইনাশক ও অন্যান্য জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে ফসলকে রোগবালাই থেকে রক্ষা করা যায়। আধুনিক সেচ প্রযুক্তি ব্যবহার করে কম পানিতে বেশি জমিতে চাষ করা যায়। মাটির পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ করলে মাটির গুণাগুণ অক্ষুণ্ণ থাকে এবং উৎপাদন বৃদ্ধি পায়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও জলবায়ু সহনশীল ফসলের জাত ব্যবহার করে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়। বিজ্ঞানভিত্তিক চাষাবাদ, উন্নত বীজ, সঠিক সার ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে  একই জমি থেকে তুলনামূলক বেশি ফসল উৎপাদন করা সম্ভব। আধুনিক গুদাম, হিমাগার ও সংরক্ষণ প্রযুক্তির মাধ্যমে উৎপাদিত ফসল দীর্ঘদিন ভালো রাখা যায়। এর ফলে ফসল নষ্ট হওয়ার পরিমাণ কমে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কৃষক আবহাওয়া, বাজারদর, রোগবালাই ও চাষাবাদ সম্পর্কে দ্রুত তথ্য পেতে পারেন। লবণাক্ততা, খরা, অতিবৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার মতো সমস্যার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে বিজ্ঞানীরা সহনশীল ফসলের জাত ও আধুনিক কৃষি পদ্ধতি উদ্ভাবন করছেন। উৎপাদন বৃদ্ধি ও খরচ কমার ফলে কৃষকের লাভ ও জীবনমান উন্নয়ন হয়। কৃষকের অভিজ্ঞতার সাথে বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের কৃষি আরও উন্নত হবে।

কৃষি কাজে বিজ্ঞানের ব্যবহার

কৃষি কাজে বিজ্ঞান আধুনিক কৃষির মূল ভিত্তি। বিজ্ঞানের ব্যবহার কৃষিকাজকে সহজ দ্রুত এবং অধিক ফলনশীল করেছে। বর্তমানে কৃষির প্রায় প্রতিটি ধাপেই বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার দেখা যায়।  উন্নত ও উচ্চফলনশীল বীজ উদ্ভাবন ও ব্যবহার। আধুনিক সেচ ব্যবস্থা ড্রিপ ও স্প্রিংকলার সেচের ব্যবহার। ট্রাক্টর পাওয়ার টিলার হারভেস্টার ও  থ্রেশারের মতো আধুনিক কৃষিযন্ত্রের ব্যবহার মাটির পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী সার প্রয়োগ। রোগ ও পোকামাকর দমনে উন্নত কীটনাশক ও জৈব বালাই নাশকের ব্যবহার।  আবহাওয়ার পূর্বাভাসের ভিত্তিতে চাষাবাদ ও ফসল সংগ্রহের পরিকল্পনা। জৈবপ্রযুক্তির মাধ্যমে রোগ ও খরা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন। মোবাইল অ্যাপ ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কৃষি পরামর্শ  ও বাজার তথ্য সংগ্রহ। 

বাংলাদেশের কৃষি

বাংলাদেশ একটি কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের অর্থনীতি, খাদ্য নিরাপত্তা এবং গ্রামের মানুষের জীবিকার সাথে কৃষিখাত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। বাংলাদেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভশীল। বাংলাদেশের প্রধান কৃষিজ ফসলের মধ্যে ধান, পাট, গম, ভুট্টা, আলু, আখ, ডাল,তেলবীজ, চা, শাকজবজি ও বিভিন্ন ধরনের ফল উল্লেখযোগ্য । এর মধ্যে ধান দেশের প্রধান খাদ্যশস্য এবং পাট বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসল। উর্বর মাটি পর্যাপ্ত সূর্যালোক এবং অনুকূল জলবায়ুর কারণে বাংলাদেশে সারা বছর বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করা সম্ভব। আধুনিক কৃষিযন্ত্র, উন্নত জাতের বীজ, সেচব্যবস্থা, সার ও কীটনাশকের সঠিক ব্যবহার কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে কৃষি খাত নানা চ্যালেঞ্জেরও সম্মুখীন। জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, নদীভাঙ্গন, লবণাক্ততা,ফসলের রোগবালাই এবং কৃষিজমি কমে যাওয়া কৃষির জন্য বড় সমস্যা। এসব দূর্যোগ মোকাবিলায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, গবেষণা, কৃষকদের প্রশিক্ষণ এবং সরকারি সহায়তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আজ থেকে অর্ধশত বছর আগে আজও যে অবস্থার আমুল পরিবর্তন হয়েছে তা জোর দিয়ে আমরা বলতে পারিনা। অথচ আমাদের কৃষক সম্প্রদায় জমি চাষের জন্য গবাদি পশুচালিত সনাতন লাঙল ব্যবহার করে। কৃষি প্রযুক্তি এখনো আমাদের দেশে সুলভ নয়। প্রযুক্তি জ্ঞানও আমাদের কাছে সীমিত।  ফলে আমাদের কৃষি আজও পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে কৃষকের ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কৃষকের কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে দেশের মানুষের খাদ্যের জোগান নিশ্চিত হয়। কৃষকদের সহজ শর্তে ঋণ, উন্নত বীজ, সার, সেচ সুবিধা, কৃষি প্রশিক্ষণ এবং উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য দাম নিশ্চিত করা প্রয়োজন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার, কৃষকের দকাষতা বৃদ্ধি এবং সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশের কৃষি আরও উৎপাদনশীল ও লাভজনক হয়ে উঠবে। 

বাংলাদেশে বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষিকাজের গুরুত্ব

ক্ষুদ্রায়তন বাংলাদেশের জনসংখ্যার বিপুলতা অপেক্ষা কৃষি জমির পরিমাণ খুবই কম। আগে একটা সময় ছিল  আমাদের দেশের প্রচলিত প্রাচীন চাষাবাদ পদ্ধতি জনসংখ্যা বৃদ্ধির সাথে সমতা বজায় রেখে কৃষিক্ষেত্রে ফসল উৎপাদন করতে পারতো না। কিন্তু এখন বিজ্ঞানের আবিষ্কার তা সম্ভব করে দিয়েছে। দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের সাথে কৃষি সরাসরি জড়িত। কিন্তু জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমে যাওয়া, জলবায়ু পরিবর্তন, বন্যা, খরা, লবণাক্ততা ও রোগবালাইয়ের মতো নানা সমস্যর কারণে কৃষিতে আধুনিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির ব্যবহার অত্যন্ত প্রয়োজন। বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি বলতে গবেষণা, আধুনিক ও বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ব্যবহার করে পরিকল্পিতভাবে কৃষিকাজ করাকে বোঝায়।  উন্নত জাতের বীজ, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা এবং বৈজ্ঞানিক চাষাবাদের মাধ্যমে প্রতি একরে বেশি ফসল উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদা পূরণে বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে রোগমুক্ত পুষ্টিকর ও উন্নত মানের ফসল উৎপাদন করা যায়। আধুনিক প্রযুক্তি জৈব ও সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ফসলের ক্ষতি কমানো সম্ভব।ট্রাক্টর, পাওয়ার টিলার  হারভেস্টারসহ আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে কম সময়ে বেশি কাজ করা যায়। উৎপাদন বৃদ্ধি ও খরচ কমার ফলে কৃষকের লাভ বাড়ে এবং জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়। মাটি পরীক্ষা এবং সুষম সার প্রয়োগ পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জমির উর্বরতা বজায় রাখা যায়। খরা, লবণাক্ততা ও বন্যা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে জমির উর্বরতা বজায় রাখা যায়। বাংলাদেশের কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, লাভজনক করতে বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষির গুরুত্ব অপরিসীম। কৃষকের অভিজ্ঞতার সাথে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে অল্প জমি ও সীমিত সম্পদ ব্যবহার করে অধিক ও মানসম্মত ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হবে। কৃষকদের আধুনিক প্রশিক্ষণ, উন্নত বীজ, কৃষিযন্ত্র, সেচসুবিধা ও কৃষি গবেষণার ফল সহজে পৌছে দেওয়ার মাধ্যমে বাংলাদেশের বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষির আরও বিস্তার ঘটাতে জরুরি। 

কৃষক ও কৃষি 

কৃষক ও কৃষি একে অপরের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। কৃষক হলো কৃষির প্রাণ, আর কৃষি হলো মানুষের জীবন ও জীবিকার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও গ্রামীণ জীবনে কৃষির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি। কৃষক ভোর থেকে শুরু করে দিনের দীর্ঘ সময় মাঠে কাজ করেন। জমি প্রস্তুত করা, বীজ বপন, চারা রোপন, সেচ দেওয়া, সার প্রয়োগ, আগাছা পরিষ্কার, রোগ পোকা দমন এবং ফসল কাটাসহ কৃষিকাজের প্রতিটি ধাপে কৃষকের শ্রম ও দক্ষতা প্রয়োজন। কৃষক আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। তারা কঠোর পরিশ্রম করে ধান, গম, সবজি, ফল, ডাল, তিল, পাটসহ বিভিন্ন ফসল উৎপাদন করেন। পাশাপাশি দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ করেন। কৃষকের শ্রম ও মেধার ফলেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় এবং অর্থনীতি সমৃদ্ধ হয়। তাই কৃষককে দেশের অন্নদাতা বলা হয়। কৃষি বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাত। এটি শুধু খাদ্য উৎপাদনই নয়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, শিল্পের কাচামাল সরবরাহ এবং রপ্তানি আয় বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানুষের জীবনকে নিরাপত্তাদানের ব্যাপারে কৃষির বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তার সাথে বিজ্ঞানের সংযোগ ঘটেছে ঠিকই, তবে ব্যাপক সম্পর্ক গড়ে ওঠেনি । উন্নত দেশগুলিতে কৃষিকাজে বিজ্ঞানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে ওঠলেও আমাদের দেশে  তেমন অগ্রগতি সাধিত হয়নি। কৃষিব্যবস্থা এখনো প্রাচীন পদ্ধতিতেই চলছে। উন্নত কৃষি পদ্ধতির সঙ্গে আমাদের দেশের নিরক্ষর কৃষক সমাজ এখনো পরিচিত হয়ে ওঠতে পারে নি। আধুনিক কৃষিব্যবস্থা প্রয়োগের মতো জ্ঞান ও অর্থ তাদের নেই। এতে ফসলের উৎপাদন কম হয়। এছাড়াও আমাদের দেশের কৃষকদের এখনো দেখা যায় খরা, জড়, বৃষ্টির মধ্যে ক্ষেতে কাজ করতে। অনেক সময় তো বন্যার পানিতে ফসল তলিয়ে যায়। ফলে অনেকটা ভাগ্যের ওপর নির্ভরশীল হতে হয়।  কৃষক আমাদের খাদ্য ও অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। কৃষকের পরিশ্রম ও কৃষির উন্নয়ন ছাড়া দেশের উন্নয়ন সম্ভব নয়। আমাদের উচিৎ কৃষকদের সম্মান, সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ সুবিধা দিয়ে কৃষিকে আরও আধুনিক ও সমৃদ্ধ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।  

কৃষিতে বিজ্ঞানের দান ও অবদান

কৃষি মানুষের জীবন ও সভ্যতার অন্যতম প্রধান ভিত্তি। মানুষের খাদ্য, পোশাক  ও বিভিন্ন শিল্পের কাচামালের একটি বড় অংশ কৃষি থেকে আসা। আধুনিক যুগ কৃষির উন্নয়নে বিজ্ঞানের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞান কৃষিকে শুধু প্রাকৃতিক নির্ভর  কাজ থেকে আধুনিক, পরিকল্পিত ও উৎপাদনশীল ব্যবস্থায় রূপান্তর করেছে। কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের দান বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সমস্যাটি সমগ্র বিশ্বে বিদ্যমান থাকায় কৃষির উৎপাদন বাড়িয়ে তা মোকাবিলা করার উদ্যোগ উন্নত বিশ্বে দেখা যায়। ফলে কৃষিক্ষেত্রে বিজ্ঞানের প্রয়োগ হওয়ায় কৃষির অনেক উন্নতি সাধিত হয়েছে। চাষাবাদ পদ্ধতি এখন যান্ত্রিককরণ করা হয়েছে। কৃষি উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যবস্থায় বিজ্ঞান অবদান রেখেছে। বীজ উৎপাদন ও সংরক্ষণে বিজ্ঞানের সাহায্য নেয়া হচ্ছে। সার, সেচ ইত্যাদি ক্ষেত্রে বিজ্ঞানের ব্যবহার হচ্ছে। বিভিন্ন কৃষিজ ফসল নিয়ে গবেষণার মাধ্যমে উন্নতমানের এবং বেশি পরিমাণে ফসল ফলনের উপায় উদ্ভাবন করা হয়েছে। এসব অগ্রগতির ফলে বিশ্বের বহুদেশে কৃষির উৎপাদন প্রচুর বেড়েছে এবং এই ফসল বিভিন্ন দেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। অন্যান্য  ক্ষেত্রের মতো কৃষি কাজেও বিজ্ঞানের অবদান রয়েছে। বর্তমানে কৃষিকাজে বিজ্ঞানের প্রয়োগ হওয়ায় কৃষির যথেষ্ট উন্নতি সাধিত হয়েছে। চাষাবাদ পদ্ধতি এখন যান্ত্রিকীকরণ করা হয়েছে। আদিম লাঙ্গল মই প্রযুক্তি পরিহার করে বর্তমানে ট্রাক্টরের সাহায্যে অতি স্বল্প সময়ে অধিক পরিমাণ জমি চাষাবাদ করা হচ্ছে। কৃষি উৎপাদনের সামগ্রিক ব্যবস্থায় বিজ্ঞান অবদান রেখেছে।  উৎপাদন বাড়ানো, শ্রম ও খরচ কমানো এবং ফসল সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষকের লাভ বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে। কৃষকের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। কৃষিতে বিজ্ঞানের দান ও অবদান সত্যিই অপরিসীম। উন্নত বীজ থেকে শুরু করে আধুনিক কৃষিযন্ত্র, সেচব্যবস্থা, মাটি পরীক্ষা, রোগ পোকা দমন, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও তথ্যপ্রযুক্তি সব ক্ষেত্রেই বিজ্ঞান কৃষিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। বিজ্ঞানের সঠিক ব্যবহার ও কৃষকের অভিজ্ঞতার সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের কৃষি আরও আধুনিক, উৎপাদনশীল ও লাভজনক হবে।  

বিভিন্ন দেশে কৃষিকাজে বিজ্ঞান

বর্তমান বিশ্বে কৃষি আর শুধু প্রচলিত পদ্ধতির ওপর নির্ভরশীল নয়। বিভিন্ন দেশ বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে কৃষিকে আরও উৎপাদন, লাভজনক ও পরিবেশবান্ধব করে তুলেছে। উন্নত দেশসমূহে আজ কৃষিকাজ সম্পূর্ণভাবে বিজ্ঞানের ওপর নির্ভশীল। জমি কর্ষণ, বীজ বপন, সেচকার্য, ফসলকাটা, মাড়াই, বাচাই ইত্যাদি সব কাজ আজ যন্ত্রের সাহায্যে সম্পাদন করা হয়। ট্রাক্টরের সাহায্যে জমি চাষ করে মেশিন দিয়ে জমিতে বীজ বপন করা হয়। বপনের জন্য সংরক্ষিত বীজ বাচাই কাজও যন্ত্রের সাহায্যে করা হয়। জমিতে প্রয়োজন মতো সার দেওয়া কিংবা ফসলে পোকা লাগলে পোকা দমনের জন্য ওষুধ ছিটানোর কাজও যন্ত্রের সাহায্যে করা হয়। জাপানে জমির স্বল্পতা ও জনসংখ্যার ঘনত্বের কারণে উন্নত কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। নেদারল্যান্ডস ছোট আয়তনের দেশ হলেও কৃষি উৎপাদনে দেশ সফল। ইসরায়েল পানি স্বল্পতার মধ্যেও কৃষিকে উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করছে। যুক্তরাষ্ট্রে বৃহৎ আকারের কৃষিতে ট্রাক্টর, কম্বাইন হারভেস্টার, জিপিএস ড্রোন, স্যাটেলাইট তথ্য ও নির্ভুল কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। চীনে কৃষি গবেষণা, উন্নত জাতের বীজ, কৃষিযন্ত্র ও আধুনিক সেচব্যবস্থার ব্যবহার অনেক। ভারতে কৃষিতে উন্নত বীজ, সেচ প্রযুক্তি, কৃষিযন্ত্র, আবহাওয়ার তথ্য এবং ডিজিটাল কৃষি সেবা ব্যবহার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশও অনেক কিছু শিখতে পারে। আজকের যুগে ফসলের জমিতে সেচের জন্য মানুষ আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে না। অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টি শস্য জন্মানোর অন্তরায় হয় না। আজ মানুষ গভীর নলকূপ এবং পাম্পের সাহায্যে জমিতে সেচ দেয়। ফসল কাটার যন্ত্রের সাহায্যে একদিকে ফসল কাটছে অন্যদিকে মাড়াই হয়ে শস্য ও খর আলাদা হয়ে যাচ্ছে। উন্নত দেশের লোকেরা কৃষিকাজকে যান্ত্রিক করে ফেলেছে। শীতপ্রধান দেশে শীত নিয়ন্ত্রণ ঘর বানিয়ে শাক সবজি ও ফলমূল সংরক্ষণ করছে। বিজ্ঞানের সাহায্যে বর্তমানে শুষ্ক মরুভূমির মতো জায়গাতে সেচ, সার ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় চাষাবাদ করে সোনার ফসল ফলাচ্ছে। যার ফলে বিজ্ঞান কৃষিকাজে এক যুগান্তকারী বিপ্লব সৃষ্টি করেছে।

বাংলাদেশে কৃষিকাজে বিজ্ঞান

বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। দেশের মানুষের খাদ্যচাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক উন্নয়নে কৃষির গুরুত্ব অনেক। বর্তমান সময়ে জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিজমি কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগের মতো শুধু প্রচলিত পদ্ধতিতে কৃষি কাজ করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশের কৃষিতে বিজ্ঞান ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার অত্যন্ত প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশে কৃষি উন্নয়নে বিজ্ঞানের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে কৃষিকাজ এখন আরও সহজ দ্রুত এবং লাভজনক হয়েছে। বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি দেশের খাদ্য উদপাদন বৃদ্ধি কৃষকের আয় বৃদ্ধি এবং খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। আমাদের দেশেও এখন কৃষিকাজে বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। খন্ডবিখন্ডতার কারণে জমি কর্ষণে অবশ্য ব্যাপকভাবে ট্রাক্টর ব্যবহার করা যাচ্ছেনা মানুষ এখন আর চাতকের ন্যায় বৃষ্টিধারার জন্য আকাশের দিকে থাকিয়ে থাকে না। এখন সেচের জন্য ব্যবহার করা হয় গভীর নলকূপ এবং মেশিনচালিত পাম্প। বপনের জন্য ব্যবহার করা হয় উন্নত জাতের বীজ।  বীজ সংরক্ষণে সাহায্য নেয়া হয় বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তির রাসায়নিক সার ব্যবহার করে ফসল উৎপাদনের মাত্রা বাড়ানো হচ্ছে। আগে যে জমিতে এক ধরনের ফসল হত বিজ্ঞানের সাহায্যে এখন সেখানে তিন ধরনের ফসল হয়। তবে আমাদের দেশের কৃষিকাজ এখনও সম্পূর্ণ যান্ত্রিক করা সম্ভব হয়নি। চাষাবাদে বিজ্ঞানকে কাজে লাগাতে পারলে আমাদের খাদ্য সমস্যা সমাধান করা যাবে এটা নিশ্চিত বলা যায়। বিজ্ঞানের কল্যাণে বাংলাদেশের কৃষক আরও আধুনিক উৎপাদনশীল ও টেকসই হয়েছে। ভবিষ্যতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির আরও ব্যাপক ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে কৃষির উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে। কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন হবে এবং দেশের খাদ্য নিরাপত্তা আরও শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে বিজ্ঞানের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উন্নত বীজ থেকে শুরু করে আধুনিক যন্ত্র, সেচ, মাটি পরীক্ষা, আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও ডিজিটাল প্রযুক্তি সব ক্ষেত্রেই বিজ্ঞান কৃষিকে সহজ ও উৎপাদনশীল করে তুলেছে। কৃষকের কাছে আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সহজলভ্য করা এবং কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দেওয়া গেলে বাংলাদেশের কৃষি আরও উন্নত হবে। 

কৃষিকাজে বিজ্ঞানের সফল প্রয়োগের উপায়

কৃষির উৎপাদন বাড়ানো,কৃষকের শ্রম ও খরচ কমানো এবং ফসলের মান উন্নত করার জন্য বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। শুধু আধুনিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন করলেই হবে না, তা কৃষকের কাছে সহজলভ্য ও ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে হবে। উচ্চফলনশীল, রোগপ্রতিরোধী, খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল বীজ কৃষকদের  সরবরাহ করতে হবে। চাষ, বীজ বপণ, রোপন, ধান কাটা ও  মাড়াইয়ের কাজ আধুনিক কৃষিযন্ত্র ব্যবহার করতে হবে। ফসলের রোগ ও ক্ষতিকর পোকা শনাক্ত করে প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। কৃষকদের আধুনিক প্রযুক্তি ও বৈজ্ঞানিক চাষাবাদ সম্পর্কে হাতে কলমে প্রশিক্ষণ দিতে হবে।বর্তমানে বিভিন্ন সরকারি কৃষি সংস্থা বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এবং প্রযুক্তিতে কৃষির ওপর গবেষণা চালাচ্ছে। দেশের কৃষকদের এ পরীক্ষা নিরীক্ষার ফল জানিয়ে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে এবং তারা যাতে বিজ্ঞানসম্মতভাবে কৃষিকাজ করতে পারে সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কৃষি বিদ্যায় শিক্ষাপ্রাপ্ত কৃষি কর্মীদের গ্রামে গ্রামে কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে হবে। হাতে কলমে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ দিয়ে প্রতিটি কৃষককে সচেতন ও দক্ষভাবে গড়ে তুলতে পারলে বাংলাদেশের কৃষিকাজে বিজ্ঞানের সর্বাঙ্গীন প্রয়োগ ত্বরান্বিত হবে এবং এদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অধিকতর নিশ্চিত হবে। বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি আজ সময়ের দাবি। আধুনিক প্রযুক্তি, গবেষণা, উন্নত বীজ, সঠিক সার ব্যবস্থাপনা, যান্ত্রিকীকরণ এবং তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার কৃষিকে আরও উৎপাদনশীল, লাভজনক ও টেকসই করে তুলেছে। তাই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কৃষিতে বিজ্ঞানের সফল প্রয়োগের কোনো বিকল্প নেই। কৃষিকাজে বিজ্ঞানের সফল প্রয়োগের জন্যকৃষক. কৃষিবিজ্ঞানী ও সরকারের মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন। আধুনিক প্রযুক্তিকে  কৃষকের নাগালের মধ্যে এনে সঠিক প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া গেলে কম  খরচে বেশি উৎপাদন সম্ভব হবে। কৃষিকাজে বিজ্ঞানের সফল প্রয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি, উৎপাদন খরচ কম, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং কৃষকের জীবনমান উন্নয়ন সম্ভব। তাই কৃষি উন্নয়নের জন্য বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি পদ্ধতির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

কৃষিকাজের উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে বিজ্ঞানের ভূমিকা অপরিসীম। একসময় কৃষককে সম্পূর্ণভাবে প্রকৃতি ও  প্রচলিত কৃষিপদ্ধতির  ওপর নির্ভর করে চাষাবাদ করতে হতো। ফলে বন্যা, খরা, রোগবালাই, পোকামাকড় ও অনুকূল আবহাওয়ার অভাবে ফসলের অনেক ক্ষতি হতো। কিন্তু বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে কৃষিকাজে এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। উন্নত ও উচ্চফলনশীল বীজ, আধুনিক সেচব্যবস্থা, মাটি পরীক্ষা, সার ব্যবস্থাপনা, কৃষিযন্ত্র, রোগ পোকা দমন প্রযুক্তি এবং আবহাওয়ার পূর্বাভাস কৃষিকে করেছে আরও সহজ ও উৎপাদনশীল।  বিজ্ঞানের সাহায্যে অল্প জমিতে অধিক ফসল উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে। আধুনিক কৃষিযন্ত্র কৃষকের সময়, শ্রম ও খরচ কমাতে সাহায্য করছে। একই সাথে কৃষি গবেষণার মাধ্যমে বন্যা, খরা ও লবণাক্ততা সহনশীল ফসলের জাত উদ্ভাবন করা হচ্ছে। মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটের মাধ্যমে কৃষকের কাছে দ্রুত কৃষি পরামর্শ, আবহাওয়ার তথ্য  ও বাজারদর পৌছে দেওয়াও কৃষিতে বিজ্ঞানের একটি বড় সাফল্য।  কৃষকের অভিজ্ঞতা এবং বিজ্ঞানের জ্ঞান ও প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটাতে পারলে বাংলাদেশের কৃষি আরও  উন্নত ও লাভজনক হয়ে উঠবে। কৃষির উন্নয়ন মানেই দেশের খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথকে আরও শক্তিশালী করা। 

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url