জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ।

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত ও উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জ। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘনবসতি, দীর্ঘ উপকূলীয় এলাকা এবং কৃষি নির্ভরতার কারণে জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে বিভিন্নভাবে অনুভূত হতে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদীভাঙন, খরা ও উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা মানুষের জীবন ও জীবিকার  ওপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ভবিষ্যতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পেলে উপকূলীয় অঞ্চলের বসতি, কৃষি জমি ও মিঠা পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুকি রয়েছে। একই সাথে অতিরিক্ত তাপমাত্রা কৃষি উৎপাদন,, শ্রমজীবি মানুষের কর্মক্ষমতা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে কিছু মানুষ জীবিকার সন্ধানে গ্রাম থেকে শহরে বা ঝুকিপূর্ণ এলাকা থেকে অপেক্ষাকৃত নিরাপদ এলাকায় স্থানান্তরিত হতে পারেন।  মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ড, জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার, বন উড়ার, শিল্পকারখানার ধোয়া এবং গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণের কারণে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে জলবায়ুর স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের  অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত আবহাওয়া এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ার ফলে মানবসভ্যতা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। ভবিষ্যতে বাংলাদেশের  নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা অনেকাংশে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলার উপর নির্ভরশীল।

যদি জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হয় তাহলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশ আরও উষ্ঞ, দূষিত ও  দুর্যোগ প্রবণ হয়ে উঠতে পারে। উপকূলীয় অনেক এলাকা সমুদ্রে তলিয়ে যাওয়ার ঝুকিতে পরবে। কোটি কোটি মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাস্তুচ্যুত হতে পারে এবং খাদ্য ও পানির সংকট  আরও তীব্র হতে পারে। সময় মতো সঠিক উদ্যোগ নিলে একটি নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তুলা সম্ভব। জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি মোকাবিলায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু সংকটের নয় প্রস্তুতি ও অভিযোজনেরও। টেকসই কৃষি, লবণাক্ততা ও খরা সহনশীল ফসল, বনায়ন, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার, নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণ, উন্নত বাধ ও আশ্রয়কেন্দ্র, আগাম সতর্কবার্তা এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা ও জনগনের মধ্যে জলবায়ু সচেতনতা বৃদ্ধি গুরুত্বপূর্ণ। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিত উদ্যোগ ভবিষ্যতের ঝুকি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে পরিকল্পিত উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও জলবায়ু অভিযোজনকে গুরুত্ব দিলে বাংলাদেশ আরও নিরাপদ, সহনশীল ও টেকসই ভাবষ্যতের দিকে এগিয়ে যেতে পারে। 

জলবায়ুৃ পরিবর্তনের ধারণা

জলবায়ু পরিবর্তন বলতে পৃথিবীর কোনো অঞ্চল বা সমগ্র পৃথিবীর দীর্ঘমেয়াদি আবহাওয়ার  ধরন তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, আদ্রতা,বাতাসের প্রবাহ ও ঋতুচক্রে স্থায়ী পরিবর্তনকে বোঝায়। সাধারণত কয়েকশ দশক বা তারও বেশি সময় ধরে এসব পরিবর্তন ঘটলে তাকে জলবায়ু পরিবর্তন বলা হয়। দীর্ঘসময় ধরে পৃথিবীর তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, বায়ুপ্রবাহ ও অন্যান্য আবহাওয়াগত উপাদানের পরিবর্তনকে জলবায়ু পরিবর্তন বলা হয়। জলবায়ু পরিবর্তন স্বাভাবিক প্রাকৃতিক কারণে ঘটতে পারে, তবে বর্তমান সময়ে মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডের কারণে  জলবায়ু পরিবর্তনের গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বর্তমানে এই পরিবর্তন দ্রুত ঘটছে। ফলে পৃথিবীর প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে এবং পরিবেশের ওপর  অনেক নেতিবাচক প্রভাব পরছে। বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো মানুষের কর্মকান্ড। জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা, তেল ও গ্যাস) পোড়ানো, বন উজার, শিল্পকারখানা ও যানবাহন থেকে নির্গত কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেনসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউজ গ্যাস বায়ুমন্ডলে জমা হয়ে পৃথিবীর তাপমাত্রা বৃদ্ধি করছে। ফলে বৈশ্বিক উষ্ঞায়ন সৃষ্টি হচ্ছে, যা জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান কারণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পৃথিবীতে তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি  এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় দেখা দিচ্ছে। বাংলাদেশও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে ঝুকিপূর্ণ দেশ।  বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ  ও উপকূলীয় দেশের জন্য জলবায়ু পরিবর্তন  কৃষি, পানি, স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও মানুষের জীবন জীবিকার  ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের ধারণা বোঝা এবং এর ঝুকি মোকাবিলায় সচেতনতা ও কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ করা অত্যন্ত জরুরি। 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ

জলবায়ু পরিবর্তনের পেছনে প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট দুই ধরনের কারণ রয়েছে। বর্তমান সময়ে দ্রুত জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হিসেবে মানুষের কর্মকান্ড থেকে উৎপন্ন গ্রিনহাউজ গ্যাসের অতিরিক্ত নিঃসরণকে ধরা হয়। এসব গ্যাস বায়ুমন্ডলে তাপ আটকে রাখে এবং পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বাড়ায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণ হলো মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ড। জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার, বন উজার, শিল্পকারখানার ধোয়া ও যানবাহনের নির্গত গ্যাস বায়ুমন্ডলে গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমাণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। ফলে পৃথিবীর তাপমাত্রা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।  জলবায়ু পরিবর্তনের প্রধান কারণগুলো হলো  কয়লা, তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়ানোর কারণে প্রচুর কার্বন ডাই অক্সাইড বায়ুমন্ডলে নিঃসৃত হয়, যা বৈশ্মিক উষ্ঞায়ন বৃদ্ধি করে।  বিভিন্ন শিল্পকারখানা থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড, মিথেন ও অন্যান্য গ্রিন হাউজ গ্যাস নির্গত হয়, যা জলবায়ু পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করে। গাছপালা কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে। কিন্তু অতিরিক্ত বন উজারের ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং বায়ুমন্ডলে কার্বনের পরিমাণ বেড়ে যায়। ধানক্ষেত ও গবাদিপশু থেকে মিথেন গ্যাস নির্গত হয়। এই সব গ্যাস গ্রিনহাউজের প্রভাব বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শহর সম্প্রসারণ, অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যবহার ও সবুজ  এলাকা কমে যাওয়ার কারণে পরিবেশের ওপর চাপ বৃদ্ধি পায়।  পেট্টোল ও ডিজেলচালিত যানবাহন বিপুল পরিমাণ ক্ষতিকর গ্যাস নিঃসরণ করে, যা বায়ুদূষণ ও বৈশ্বিক উষ্ঞায়নের অন্যতম কারণ। শহরাঞ্চলে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধি জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি বায়ুদূষণও বাড়ায়। খোলা জায়গায় বর্জ্য ফেলা ও পচনশীল বর্জ্যের অপর্যাপ্ত ব্যবস্থাপনার  ফলে মিথেনের মতো গ্রিনহাউজ গ্যাস তৈরি হতে পারে। অতিরিক্ত উৎপাদন, পণ্য ব্যবহার এবং অপচয়ের ফলে জ্বালানি ও প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার বাড়ে। 

প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি

জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো  বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুকি ও তীব্রতা বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা ও অতিবৃষ্টির মতো দুর্যোগের জন্য ঝুকিপূর্ণ। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে এসব দুর্যোগের ধরন, সময় ও তীব্রতায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। ফলে মানুষের জীবন জীবিকা, কৃষি, অবকাঠামো ও  অর্থনীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হতে পারে। উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়ের সাথে জলোচ্ছ্বাস ও লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে ঘরবাড়ি, কৃষি জমি ও মিঠা পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।  অতিবৃষ্টির কারণে শহর ও গ্রামাঞ্চলে  জলাবদ্ধতা ও বন্যা দেখা দিতে পারে।  বর্তমানে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ও সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে দুর্যোগ আরও ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে  ঘূর্ণিঝড়,বন্যা, খরা এবং তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এসব দুর্যোগ মানুষের জীবন, সম্পদ এবং অর্থের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। ভবিষ্যতে এই ঝুকি আরও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। যেসব কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে তা  হলো  সমুদ্রের তাপমাত্রা বাড়ায় শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ঝুকি বাড়ছে। অতিবৃষ্টি ও নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ঘন ঘন বন্যা দেখা দিচ্ছে।  অনেক অঞ্চলে  দীর্ঘসময় বৃষ্টিপাত না হওয়ায় খরা এবং তীব্র তাপপ্রবাহ সৃষ্টি হচ্ছে। হিমবাহ গলে যাওয়ার ফলে উপকূলীয় এলাকায় প্লাবিত হওয়ার ঝুকি বাড়ছে।  অতিবৃষ্টির কারণে পাহাড়ি এলাকায়  ভূমিধসের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে। কৃষিজ ফসল নষ্ট হচ্ছে, খাদ্য উৎপাদন কমছে  এবং কৃষকের জীবন জীবিকা হুমকির মুখে পড়ছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতে আগাম সতর্কবার্তা, দুর্যো গপ্রস্তুতি, আশ্রয়কেন্দ্র , বাধ ও উপকূলীয় সুরক্ষা ব্যবস্থা, নদী ও জলাভূমি সংরক্ষণ এবং বৃক্ষরোপণ জোরদার করা প্রয়োজন। 

সুন্দরবনের ওপর প্রভাব

সুন্দরবন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ  প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান আবাসস্থল।  জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সুন্দরবন ও এর আশপাশের পরিবেশ বিভিন্ন ধরনের  ঝুকির মুখে পড়ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রার পরিবর্তন সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়লে সুন্দরবনের নিচু অঞ্চলেগুলোতে লবণাক্ত পানি প্রবেশের ঝুকি বাড়ে। এতে মাটি ও পানির লবণাক্ততা বৃদ্ধি পেয়ে অনেক উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। লবণাক্ততার পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবনের বিভিন্ন প্রজাতির উদ্ভিদ ও জলজ প্রাণীর আবাসস্থলেও পরিবর্তন আসতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সুন্দরবনের বণ্যপ্রাণীর ওপরও পড়তে পারে। 

 কৃষির ওপর নেতিবাচক  প্রভাব

জলবায়ু পরিবর্তনের  ফলে বাংলাদেশের কৃষি খাত নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে পারে। দেশের কৃষি অনেকাংশে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত ও পানির প্রাপ্যতার ওপর নির্ভরশীল। এসব প্রাকৃতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন ঘটলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা  থাকে। অতিরিক্ত তাপমাত্রা অনেক ফসলের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ও ফলনকে প্রভাবিত করতে পারে। কৃষি সম্পূর্ণভাবে জলবায়ুর ওপর নির্ভরশীল। জলবায়ু পরিবর্তনের  ফলে কৃষি খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  জলবায়ু পরিবর্তন কৃষি উৎপাদনের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা এবং অতিবৃষ্টির কারণে ফসল উৎপাদন ব্যহত হচ্ছে। খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ফলে ভবিষ্যতে খাদ্য সংকটের সম্ভাবনা দিন দিন বাড়তে পারে।  বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো কৃষিনির্ভর দেশের প্রভাব অত্যন্ত গুরুতর। জলবায়ু প্রভাবের ফলে কৃষির ওপর যেসব প্রভাব পড়ে তা  হলো  অতিরিক্ত তাপমাত্রা, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত এবং খরার কারণে ধান, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন কমে যায়।  বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে ফসলের মাঠ নষ্ট হয়ে কৃষকের ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি হয়। উপকূলীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পাওয়ায় মাটিতে লবণাক্ততা বাড়ে, ফলে অনেক জমিতে চাষাবাদ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার পরিবর্তনের কারণে ফসলে নতুন নতুন রোগ এবং পোকামাকড়ের আক্রমণ বাড়তে পারে।দীর্ঘমেয়াদি খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে সেচের জন্য প্রয়োজনীয় পানির অভাব দেখা দেয়।উৎপাদন কমে যাওয়ায় কৃষকের আয় হ্রাস পায় এবং খাদ্য নিরাপত্তা ঝুকির মুখে পড়ে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহনশীল জাতের ফসল, আধুনিক সেচ ব্যবস্থা, পানি সংরক্ষণ, উন্নত কৃষি প্রযুক্তি, আবহাওয়ার আগাম তথ্য এবং কৃষকদের প্রশিক্ষণ গুরুত্বপূর্ণ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে পরিবর্তিত জলবায়ুর মধ্যেও কৃষিকে আরও টেকসই ও উৎপাদশীল রাখা সম্ভব। 

 জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি

জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব হলো জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বৃষ্টিপাতের ধরনে পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা ও ঘন ঘন প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিভিন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্বাভাবিক আবাসস্থল পরিবর্তিত বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জীববৈচিত্র্য বলতে পৃথিবীর বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ, প্রাণী ও অণুজীবের আবাসস্থলের বৈচিত্র্যকে বোঝায়। পৃথিবীর বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারছেনা। ফলে অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুকিতে রয়েছে। জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করে এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এই জীববৈচিত্র্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। যেসব কারণে জীববৈচিত্র্যের ক্ষতিগুলো হলো পরিবেশের দ্রুত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পেরে অনেক বিরল উদ্ভিদ ও প্রাণী বিলুপ্তির ঝুকিতে পরছে  তাপমাত্রা বৃদ্ধি, বন উজাড়, বন্যা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে অনেক প্রাণী তাদের স্বাভাবিক  আবাসস্থল হারাচ্ছে। খরা, দাবানল, ঝড় এবং অন্যান্য দুর্যোগের কারণে বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে অসংখ্য প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবন হুমকির মধ্যে পড়ছে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দূষণ এবং পানির গুণগত মানের  পরিবর্তনের  কারণে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণীর সংখ্যা কমে যাচ্ছে। কোনো একটি প্রজাতি কমে গেলে বা বিলুপ্ত হয়ে গেলে অন্যান্য প্রাণী ও উদ্ভিদের ওপরও নেতিবাচত প্রভাব পড়ে এবং পুরো বাস্ততন্ত্রের ভারসাম্য নির্বিঘ্ন হয়।জীববৈচিত্র্যের ক্ষতির ফলে খাদ্য, ওষুধ, কৃষি এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ে, যা মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করে। জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ করলে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য  একটি সুস্থ ও নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা সম্ভব। 

 স্বাস্থ্যঝুকি বৃদ্ধি

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের ঝুকি বাড়তে পারে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, তাপপ্রবাহ, বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলাবদ্ধতা ও পানির সংকট মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে  ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি  এবং শারীরিকভাবে দুর্বল মানুষেরা অতিরিক্ত তাপ ও দুর্যোগের সময় বেশি ঝুকিতে থাকতে পারেন। বায়ুদূষণ ও অতিরিক্ত গরমের সম্মিলিত প্রভাব শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা ও অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুকি বাড়াতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তন শুধু পরিবেশের ওপর নয় স্বাস্থ্যের ওপরও গুরুতর  প্রভাব ফেলে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি,  বায়ু দূষণ,পরিবেশ দূষণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্যঝুকি বাড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন রোগের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। অতিরিক্ত গরম, পরিবেশ দূষণ এবং পানিবাহিত রোগ মানুষের স্বাস্থ্যকে ঝুকির মধ্যে ফেলছে। শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়তে পারে।স্বাস্থ্যঝুকি বৃদ্ধির প্রধান কারণগুলো হলো অতিরিক্ত গরমের কারণে হিট স্ট্রোক, পানিশূন্যতা, ক্লান্তি এবং হৃদরোগের ঝুকি বাড়ে। বন্যা ও জলাবদ্ধতার ফলে ডায়রিয়া, কলেরা এবং ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়ার মতো মশাবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়তে পারে। বায়ুদূষণ ও ধুলাবালির কারণে হাপানি, ব্রঙ্কাইটিস এবং অন্যান্য শ্বাসকষ্টজনিত রোগ বৃদ্ধি পায়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যের সংকট দেখা দিতে পারে যা অপুষ্টির ঝুকি বাড়ায়। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা অন্যান্য  দূর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে মানসিক চাপ, উদ্বেগ এবং  বিষণ্ণতা দেখা দিতে পারে। খরা, বন্যা ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে নিরাপদ পানীয় জলের অভাব সৃষ্টি হয় যা বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুকি বাড়ায়। স্বাস্থ্যঝুকি কমাতে নিরাপদ পানি ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা, স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা, তাপপ্রবাহ ও দুর্যোগের আগাম সতর্কবার্তা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ এবং জনসচেতনা বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। 

দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতি

বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, বজ্রপাত ও তাপপ্রবাহের মতো বিভিন্ন দুর্যোগের ঝুকি রয়েছে। দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে আগে থেকেই কার্যকর প্রস্তুতি নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সঠিক প্রস্তুতি থাকলে দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। দুর্যোগ মোকাবিলার ক্ষেত্রে আগাম সতর্কবার্তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। আবহাওয়ার পূর্বাভাস দ্রুত মানুষের কাছে পৌছে দেওয়া এবং ঝুকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে সময় মতো নিরাপদ স্থানে  সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় পর্যাপ্ত ও নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র তৈরি এবং সেগুলোতে প্রয়োজনীয় পানি, খাবার, ওষুধ ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা রাখা জরুরি। এছাড়া বাধ ও বেড়িবাধের রক্ষণাবেক্ষণ, নদী ও খাল সংরক্ষণ, বনায়ন এবং দুর্যোগ সহনশীল ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো  নির্মাণ করা প্রয়োজন। 

 পানি সম্পদের সংকট

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানি সম্পদের ওপর দিন দিন বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। তাপমাত্রা বৃদ্ধি, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, দীর্ঘস্থায়ী খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যার কারণে কোথাও পানির সংকট দেখা দিচ্ছে আবার কোথাও অতিরিক্ত পানির কারণে জলাবদ্ধতা ও দূষণ বাড়ছে। সমৃদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বাড়ছে যার কারণে সুপেয় পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। পানি মানুষের জীবন, কৃষি শিল্প এবং পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানির প্রাপ্যতা অনেক অঞ্চলে হুমকির মুখে পড়ছে। । অনেক অঞ্চলে খরা এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিচ্ছে। নদী, হ্রদ ও ভূগর্ভস্থ পানির উৎস ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা বিশ্বের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। যেসব কারণে পানি সম্পদের সংকটগুলো হয় তা হলো কোথাও অতিবৃষ্টি, আবার কোথাও দীর্ঘ সময় বৃষ্টি না হওয়ায় পানির স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যাহত হয়। দীর্ঘস্থায়ী খরার কারণে নদী, খাল, বিল ও জলাশয়ে পানির পরিমাণ কমে যায় ফলে পানির সংকট দেখা দেয়। অতিরিক্ত পানি উত্তোলন এবং পর্যাপ্ত পূনর্ভরণ  না হওয়ায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের নদী ও ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বাড়ছে যা বিশুদ্ধ পানির সংকট সৃষ্টি করছে। সেচের পানির অভাবে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত হয় এবং অনেক শিল্পকারখানাও পানির সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।  বিশুদ্ধ পানীয় জলের অভাবে পানিবাহিত রোগ বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। পানি সম্পদের সংকট মোকাবিলায় বৃষ্টির পানির সংরক্ষণ, পানি অপচয় রোধ, নদী খাল ও জলাশয় রক্ষা, ভূগর্ভস্থ পানির সুষ্ঠু ব্যবহার এবং লবণাক্ততা মোকাবিলায় কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।  

পরিবেশ শরনার্থীদের সংখ্যা বৃদ্ধি

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পরিবেশগত কারণে মানুষকে নিজের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র চলে যেতে হচ্ছে। পরিবেশ শরনার্থী বলতে এমন মানুষকে বোঝায়, যারা জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, নদী ভাঙন, বন্যা, খরা, ঘূর্ণিঝড় ও অন্যান্য পরিবেশগত কারণে নিজেদের বসতভিটা ছেড়ে অন্যত্র যেতে বাধ্য হন। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা  বৃদ্ধি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে বহু মানুষ বাসস্থান হারাচ্ছে। তারা অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হচ্ছে। ভবিষ্যতে পরিবেশ শরণার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেতে পারে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যার সৃষ্টি করবে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পরিবেশ শরণার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার কারণগুলো হলো  উপকূলীয় অঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় অনেক মানুষ বাড়িঘর হারিয়ে অন্য এলাকায় চলে যেতে বাধ্য হয়।  নদীর তীর ভেঙে বসতবাড়ি ও কৃষিজমি বিলিন হয়ে যাওয়ায় পরিবারগুলো নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেয়। বারবার প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ জীবিকা ও বাসস্থান হারিয়ে স্থানান্তরিত হয়। দীর্ঘস্থায়ী খরা এবং চাষাবাদের অনুপযোগী পরিবেশের কারণে অনেক কৃষক কাজ ও জীবিকার সন্ধানে অন্য অঞ্চলে চলে যান। পরিবেশগত কারণে বাস্তচ্যুত মানুষ শহরে চলে আসায় আবাসন, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়। বাস্তচ্যুত মানুষের দারিদ্র্য, বেকারত্ব, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার সংকট এবং সামাজিক বৈষম্য বৃদ্ধি পেতে পারে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় জলবায়ু সহনশীল বসতি গড়ে তোলা, দুর্যোগের আগাম সতর্কতা জোড়দার করা, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসন এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি কমাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশ সংরক্ষণ ও অভিযোজনমূলক উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। 

 বাংলাদেশের ওপর প্রভাব

বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত ও সামাজিক সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, নদী ভাঙন, লবণাক্ততা, খরা ও অনিয়মিত বৃষ্টিপাত মানুষের জীবন ও জীবিকার ওপর প্রভাব ফেলছে। ফলে কৃষি উৎপাদন ব্যাহত, উপকূলীয় এলাকায় সুপেয় পানির সংকট বৃদ্ধি, নদীভাঙনে মানুষের বসতভিটা ও জমি হারানো এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি হতে পারে। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম জলবায়ু ঝুকিপূর্ণ দেশ। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, লবণাক্ততা ও নদী ভাঙনের কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই প্রভাব  আরও তীব্র হলে মানুষের জীবন ও জীবিকা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হতে পারে। ভৌগোলিক অবস্থান, ঘন জনসংখ্যা এবং বিস্তীর্ণ  উপকূলীয় অঞ্চলের কারণে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব বাংলাদেশে তুলনামূলকভাবে বেশি অনুভূত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের ওপর যেসব প্রভাব ফেলতে পারে তা হলো  ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন এবং তাপপ্রবাহের মতো দুর্যোগের তীব্রতা ও ঘনত্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে। উপকূলীয় এলাকার অনেক জমি লবণাক্ত হচ্ছে এবং কিছু অঞ্চল প্লাবণের ঝুকি রয়েছে। অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, খরা ও লবণাক্ততার কারণে ধান, সবজি এবং অন্যান্য ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং খরার কারণে নিরাপদ পানীয় জলের অভাব দেখা দিচ্ছে। তাপপ্রবাহ, পানিবাহিত রোগ এবং ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগের ঝুকি বাড়ছে। সুন্দরবনসহ বিভিন্ন বনাঞ্চল, বন্যপ্রাণী ও জলজ সম্পদ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হুমকির মুখে পড়ছে।  নদীভাঙন, বন্যা ও উপকূলীয় ক্ষয়ক্ষতির কারণে অনেক মানুষ বাসস্থান হারিয়ে শহরে বা অন্য এলাকায় আশ্রয় নিচ্ছে। কৃষি, মৎস্য, অবকাঠামো ও পর্যটন খাত ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় জাতীয় অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি হচ্ছে। 

নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্ব

বর্তমানে জ্বালানি চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। কয়লা, তেল ও  প্রাকৃতিক গ্যাসের মতো জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের ফলে একদিকে জ্বালানির মজুত কমছে অন্যদিকে বায়ুদূষণ ও গ্রিনহাউজ গ্যাসের নি:সরণ বাড়ছে। এই পরিস্থিতিতে পরিবেশের ক্ষতি কমিয়ে মানুষের ক্রমবর্ধমান জ্বালানি চাহিদা পূরণের জন্য নবায়নযোগ্য শক্তি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। ফলে কার্বন নিঃসরণ কমাতে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।  নবায়নযোগ্য শক্তি হলো এমন শক্তি যা প্রকৃতি থেকে বারবার পাওয়া যায় এবং সহজে শেষ হয়ে যায় না। নবায়নযোগ্য শক্তি হলো সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি, জলবিদ্যুৎ, জোয়ার ভাটার শক্তি ও বারোমাসি শক্তি। জলবায়ু পনিবর্তন মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি ও জলবিদ্যুৎ পরিবেশবান্ধব শক্তির উৎস। এসব শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি করলে  জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে এবং দূষণ হ্রাস পাবে। নবায়নযোগ্য শক্তির গুরুত্বগুলো হলো  নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে কার্বন ডাই অক্সাইড ও অন্যান্য ক্ষতিকর গ্যাসের নিঃসরণ কম হয়, ফলে বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি হ্রাস পায়। সূর্য, বাতাস ও পানি প্রাকৃতিকভাবে পুনর্বীকরণ হয়। তাই এই শক্তির উৎস দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহার করা সম্ভব। তেল, গ্যাস ও কয়লার ব্যবহার কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সাহায্য করে। নবায়রযোগ্য শক্তি খাতে নতুন শিল্প, কর্মসংস্থান ও বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়।  বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় সৌরবিদ্যুৎ ও অন্যান্য নবায়রযোগ্য প্রযুক্তির মাধ্যমে সহজে বিদ্যুৎ পৌছে দেওয়া যায়। পরিচ্ছন্ন ও টেকসই জ্বালানি ব্যবহারের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তোলা সম্ভব।

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সচেতনতার গুরুত্ব

জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলায় মানুষের সচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শুধু সরকারি উদ্যোগ বা আন্তর্জাতিক চুক্তির মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তনের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয় ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও সমাজের সম্মিলিত দায়িত্বশীল আচরণও প্রয়োজন। মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণ ও এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে জানলে পরিবেশবান্ধব জীবন যাপনে আগ্রহী হতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের  ক্ষতিকর প্রভাব কমাতে জনসচেতনতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।  জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে জনগনের সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন, শক্তির সাশ্রয়ী ব্যবহার  এবং দূষণ কমানোর অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সচেতন নাগরিকরাই ভবিষ্যৎ বাংলাদেশকে সুরক্ষিত রাখতে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। মানুষ সচেতন হলে পরিবেশ রক্ষায় দায়িত্বশীল আচরণ করে এবং টেকসই জীবনযাপন গড়ে তুলতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের গুরুত্বগুলো   হলো  সচেতন মানুষ, বৃক্ষরোপণ, বন সংরক্ষণ ও পরিবেশ দূষণ কমাতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সাশ্রয়ী ব্যবহার, গণপরিবহন ব্যবহার এবং নবায়নযোগ্য শক্তি গ্রহণের মাধ্যমে গ্রিনহাউজ গ্যাসের নিঃসরণ কমানো যায়।  পানি, বিদ্যুৎ ও অন্যান্য সম্পদের অপচয় কমে এবং সম্পদ দীর্ঘদিন সংরক্ষিত থাকে। জলবায়ুজনিত  ‍দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতনতা মানুষকে আগাম প্রস্তুতি নিতে এবং ক্ষয়ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে। শিশু ও তরুণদের মধ্যে পরিবেশ রক্ষার মানসিকতা গড়ে ওঠে, যা ভবিষ্যতে টেকসই  উন্নয়নে সহায়ক হয়। ব্যক্তি, পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজ একসঙ্গে কাজ করলে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলা করা সহজ হয়। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় সচেতনতা মানুষকে শুধু সমস্যাটি বুঝতে সাহায্য করে না বরং সমাধানের অংশ হিসেবেও  দায়িত্বশীলভাবে কাজ করতে উৎসাহিত করে। পরিবেশ রক্ষা ও ভবিষ্যৎ  প্রজন্মের জন্য নিরাপদ পৃথিবী গড়ে তুলতে অনেক সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত প্রয়োজন।  

জলবায়ু পরিবর্তন বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ  দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ। ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বন্যা, র্ঘূ্ণিঝড়, নদীভাঙন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, লবণাক্ততা, খরা ও অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের মতো বিভিন্ন প্রভাব ভবিষ্যতে দেশের মানুষ, কৃষি, পানি সম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও অর্থনীতির ওপর  চাপ সৃষ্টি করতে পারে। তবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা করা অসম্ভব নয়। সঠিক পরিকল্পনা, বিজ্ঞানভিত্তিক উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করতে বনায়ন বৃদ্ধি, নদী ও জলাশয় সংরক্ষণ, নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার, পানি সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু  সহনশীল কৃষি, দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশবান্ধব নগরায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কে সাধারণ মানুষের সচেতনতা বাড়াতে হবে এবং শিশু ‍কিশোরদের পরিবেশ  রক্ষায় উৎসাহিত করতে হবে। সরকার, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, গবেষক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সাধারণ মানুষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। একই সাথে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলায় সহযোগিতা ও প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশ রক্ষা, সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সম্মিলিত উদ্যোগই হতে পারে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি মোকাবিলা করে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি বাসযোগ্য দেশ নিশ্চিত করার অন্যতম প্রধান পথ। 
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url