প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে বাংলাদেশ।

প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় সৃষ্ট এমন বিপর্যয় যা মানুষের জীবন, সম্পদ, পরিবেশ ও অর্থনীতির  ওপর অনেক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। বাংলাদেশ ভৌগলিক অবস্থানের কারণে বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুকিতে রয়েছে। প্রতিবছর বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা, বজ্রপাত, টর্নেডো ও অতিবৃষ্টির মতো দুর্যোগ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যে বন্যা ও ঘূর্ণিঝড় অন্যতম। অতিবৃষ্টি, উজান থেকে নেমে আসা পানি ও নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বন্যা দেখা দিতে পারে। অন্যদিকে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের কারণে ঘরবাড়ি, ফসল, রাস্তাঘাট ও অন্যান্য অবকাঠামোর ক্ষতি হয়। নদীভাঙনের ফলে অনেক পরিবার বসতভিটা ও কৃষিজমি হারিয়ে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম দুর্যোগ প্রবণ দেশ। ভৌগোলিক  অবস্থানগত কারণে আমদের দেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগে বেশি আক্রান্ত হয়। এ দেশটি নদীবাহিত পলিমাটিতে তৈরি একটি বদ্বীপ। বিশাল গঙ্গা, যমুনা, মেঘনার প্রবাহ মিলিয়ে সাতশত নদ নদী বয়ে গেছে এ দেশের ওপর দিয়ে। তার ওপর এ দেশের দক্ষিণাংশ জুড়ে রয়েছে বঙ্গোপসাগর, যার আকার অনেকটা ওল্টানো ফানেলের মতো। ফলে সাগরে ঝড় উঠলেই প্রবল দক্ষিণা হাওয়ার তোরে সমুদ্রের লোনা পানি উচু হয়ে গড়িয়ে পড়ে নিচু  উপকূলে।  

আর তাতেই সৃষ্টি হয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ। ভৌগোলিক দৃষ্টিকোণ থেকে বাংলাদেশে সৃষ্ট প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহকে প্রধান তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো বায়ুমন্ডলে সংঘটিত দুর্যোগ (কালবৈশাখী ঝড়, ঘূর্ণিঝড়, হারিকেন, টর্নেডো, খরা, অতিবৃষ্টি প্রভৃতি)। ভূপৃষ্টে সৃষ্ট দুর্যোগ (বন্যা, ভূমিধস. নদীভাঙন, ভূ অভ্যন্তরস্থ পানি দূষণ প্রভৃতি)। ভূ গর্ভস্থ দুর্যোগ (ভূমিকম্প ও অগ্নুৎপাত)। এসব দুর্যোগের মধ্যে ঝড় ঝঞ্ঝা, নদীভাঙন, খরা, ভূমিধস, ভূ গর্ভস্থ পানি দূষণ ইত্যাদিতে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় বেশি। ভৌগোলিক অবস্থান, অসংখ্য নদ নদী, নিচু ভূমি এবং বঙ্গোপসাগরের কাছাকাছি হওয়ার কারণে দেশে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা যায়। এসব দুর্যোগ মানুষের জীবন, কৃষি,অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর অনেক প্রভাব ফেলে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ পুরোপুরি প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়। তবে যথাযথ পরিকল্পনা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, জনসচেতনা এবং কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। সরকার ও জনগনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায়  বাংলাদেশ আরও দুর্যোগ সহনশীল দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। 

কালবৈশাখী

বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই নানা দুর্যোগ সংঘঠিত হয়ে থাকে। কালবৈশাখী বাংলাদেশের একটি পরিচিত প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এটি সাধারণত বাংলা বছরের বৈশাখ মাসে বেশি দেখা যায়।  কালবৈশাখীর ফলে বাংলার বহু এলাকা বিধ্বস্ত হয়। ঝড়ের তান্ডবলীলায় গাছপালা, ঘরবাড়ি ভেঙ্গে যায়। মারা যায় হাজার হাজার গরু বাছুর, পাখপাখালি, মানুষ হয় অসহায়। প্রচন্ড বেগে বয়ে যাওয়া এই ঝড়ের সঙ্গে বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি এবং ভারী বৃষ্টিপাতও হতে পারে। কিছুদিন পূর্বে  এমনি এক  কালবৈশাখীর শিকার হয়েছিল মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ার জনসাধারণ। ১৯৮৯ সালে সুন্দরবন  এলাকা, ১৯৯১ সালে গাজীপুর এবং ১৯৯৬ সালে টাঙ্গাইলের অনেক থানা বিধ্বস্ত হয়েছে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড়ে। নিশ্চিহ্ন হয়েছে অনেক গ্রামগঞ্জ। প্রায় প্রতি বছরই বাংলাদেশের কোনো না কোনো অঞ্চলের ওপর দিয়ে এরকম কালবৈশাখী বয়ে যায়। কালবৈশাখীর অনেকগুলো  বৈশিষ্ট্য রয়েছে হঠাৎ শুরু হয় এবং অল্প সময় স্থায়ী হয়, বাতাসের গতি অনেক বেশি হয়, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি ও বিদ্যুৎ চমকও হয়, গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ার কারণে এই ঝড় সৃষ্টি হয়। কালবৈশাখীর ফলে অনেক ক্ষতি হয় ঘরবাড়ি, গাছপালাও বিদ্যুতের খুঁটি  ভেঙে যায়, কৃষিজ ফসল, ফলের বাগান ও সবজি ক্ষেতের ক্ষতি হয়, নৌযান দুর্ঘটনার ঝুকি বাড়ে, বজ্রপাতে মানুষ ও গবাদিপশুর প্রাণহানি ঘটতে পারে, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কালবৈশাখীর ফলে আমাদের অনেক উপকারিতা হয়  তীব্র গরম থেকে সাময়িক স্বস্তি দেয়, বৃষ্টির ফলে মাটির আর্দ্রতা বৃদ্ধি পায়, কিছু ফসলের জন্য প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ হয়, পরিবেশের ধুলাবালি কিছুটা কমে যায়। কালবৈশাখীর সময় আমাদের কিছু করণীয় রয়েছে  আবহাওয়ার সতর্কবার্তা অনুসরণ করতে হবে, ঝড়ের সময় নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিতে হবে, বড় গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি ও টিনের ঘরের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে, বজ্রপাতের সময় খোলা মাঠ, নদী বা জলাশয়ে অবস্থান করা যাবে না, নৌযান চলাচলে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

ঘূর্ণিঝড়

ঘূর্ণিঝড় হলো সমুদ্রের উষ্ঞতা পানির ওপর সৃষ্ট হওয়া একটি শক্তিশালী প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এটি প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টিপাত, জলোচ্ছ্বাস এবং বজ্রঝড় নিয়ে উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানে। ঘূর্ণিঝড়ে বাতাসের তীব্রতা অনেক বেশি হয়। কখনো কখনো তা ঘন্টায় ২৫০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যায়। সমুদ্রে সৃষ্টি হয় জলোচ্ছ্বাস। প্রতিবছরই এপ্রিল মে এবং অক্টোবর নভেম্বরে বাংলাদেশে ছোট বড় ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। প্রবল শক্তি সম্পন্ন এ ঝড়ে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালীর উপকূলীয় অঞ্চল এবং সমুদ্র তীরবর্তী দ্বীপসমূহ। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ায় প্রায়ই ঘূর্ণিঝড়ের ঝুঁকির মুখে পড়ে। ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে  সমুদ্রের তাপমাত্রা বেশি হলে বাষ্পীভবন বৃদ্ধি পায়, উষ্ঞ ও আর্দ্র বায়ু দ্রুত উপরে ওঠে নিম্নচাপ সৃষ্টি করে, পৃথিবীর ঘূর্ণনের প্রভাবে বায়ু ঘূর্ণায়মান হয়ে ঘূর্ণিঝড়ের সৃষ্টি হয়। ঘূর্ণিঝড়ের ফলে অনেক ক্ষয়ক্ষতি হয় মানুষের প্রাণহানি ও অনেক ক্ষয়ক্ষতি ঘটে। ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু ও বিদ্যুতব্যবস্থা ধ্বংস হয়। কৃষিজমি, ফসল ও গবাদিপশুর ক্ষতি হয়। জলোচ্ছ্বাসে উপকূলীয় অঞ্চল প্লাবিত হয়। বিশুদ্ধ পানির সংকট ও বিভিন্ন রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। ঘূর্ণিঝড়ের কারণে যেসমস্ত ক্ষতি হয় এই ক্ষতিগুলো কমানোর উপায়ও রয়েছে  আবহাওয়ার পূর্ভাবাস ও সতর্কবার্তা অনুসরণ করা, প্রয়োজনে  দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়া, জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী প্রস্তুত রাখা, উপকূলীয় এলাকায় বেশি বেশি গাছ লাগানো এবং টেকসই বাধ নির্মাণ করা, দুর্যেোগ সম্পর্কে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা। তাই সরকার ও জনগনকে সম্মিলিতভাবে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকতে হবে।

সাইক্লোন বা জলোচ্ছ্বাস

সাইক্লোন হলো সমুদ্রের ওপর সৃষ্ট এক ধরনের শক্তিশালী নিম্নচাপজনিত ঝড়। এর সঙ্গে প্রবল বাতাস, ভারী বৃষ্টিপাত এবং জলোচ্ছ্বাস দেখা যায়। সাইক্লোন একটি উল্লেখযোগ্য বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যেোগ। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রায় বছরই সাইক্লোন হয়। এক পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিগত ১৮৫ বছরে বাংলাদেশে ৫১ বার সাইক্লোন সংঘটিত হয়েছে। ১৯৭০ সালের সাইক্লোন সবাইকে হতবাক করে দেয়। সেই ঘূর্ণিঝড়ে  বাতাসের গতিবেগ ছিল ২৫০ কিলোমিটার। রুদ্র কালনাগিনীরূপে ধ্বংসযজ্ঞ চলায় ৫ লাখেরও বেশি লোক মারা যায় সাইক্লোনের ছোবলে। ১৯৮৫ সালেও বাংলাদেশের দক্ষিণের দ্বীপাঞ্চলে হানা দেয় সর্বনাশা সাইক্লোন। সাইক্লোনের প্রচন্ড আঘাতে উড়ির চর এলাকা প্রচন্ড বিধ্বস্ত হয়। এ সময়ে প্রায় দেড় লাখের মতো লোক প্রাণ হারায় এবং ধ্বংস হয় অনেক ঘরবাড়ি ও জমির ফসল। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের দক্ষিণ অঞ্চলে সংঘটিত হয় স্মরণকালের আরও এক ভয়াবহ সাইক্লোন। বাংলাদেশের ১৬টি জেলার প্রায় ৪৭টি থানা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। যেসব কারণে সাইক্লোন সৃষ্টি হয় তা হলো সমুদ্রের উষ্ঞ পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, নিম্নচাপের সৃষ্টি এবং বায়ুর ঘূর্ণন, প্রবল বাতাসের চাপে সমুদ্রের পানি তীরের দিকে ধাবিত হওয়া, পূর্ণিমা বা অমাবশ্যার সময় জোয়ারের সঙ্গে মিলিত হলে সাইক্লোন আরও ভয়াবহ হয়। সাইক্লোনের ফলে অনেক কিছুরই ক্ষয়ক্ষতি হয়  মানুষের প্রাণহানি ও অনেক সম্পদের ক্ষতি। ঘরবাড়ি, রাস্তা, বাধ ও বিদ্যুতব্যবস্থা ধ্বংস। কৃষিজমি লবণাক্ত পানিতে প্লাবিত হয়ে ফসল নষ্ট হওয়া। পবাদিপশু ও মৎস্যসম্পদের  ক্ষতি। বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং রোগের প্রাদুর্ভাব। সাইক্লোনের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার অনেক উপায় রয়েছে  আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও সরকারি সতর্কবার্তা মেনে চলা। প্রয়োজনে দ্রুত সাইক্লোন আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নেওয়া। জরুরি খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা। উপকূলীয় এলাকায় ম্যানগ্রোভ বন ও গাছপালা সংরক্ষণ ও বৃদ্ধি করা। দুর্যেোগ মোকাবিলায় জনগনের সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ বৃদ্ধি করা। জনগনের সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে সাইক্লোনের ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। তাই সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দুর্যেোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত থাকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 

অনাবৃষ্টি বা খরা

অনাবৃষ্টি বা খরা হলো এমন একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যখন দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় খুব কম বা একেবারেই বৃষ্টিপাত হয়। এর ফলে পানি, কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলে খরার প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়। বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ হওয়ায় এদেশের কৃষিব্যবস্থা সম্পূর্ণ  প্রকৃতির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু প্রকৃতির হেয়ালিপনার শিকার এদেশ প্রায় প্রতি বছরই অনাবৃষ্টি বা খরার মতো মারাত্মক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পতিত হয়। খরার তীব্র তাপদাহের ফলে মাঠ, ঘাট ফেটে চৌচির হয়ে যায়। বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ মাসে সংঘটিত খরার প্রকোপে অনেক ফসলাদি নষ্ট হয় ও জনজীবন অতিষ্ট হয়ে ওঠে। খরার হিংস্র থাবার ফলে দেখ দেয় খাদ্যাভাব ও রোগ শোক। যেসব কারণে খরার দেখা দেয়  দীর্ঘদিন বৃষ্টিপাত না হওয়া, জলবাযু পরিবর্তনের প্রভাব, অতিরিক্ত বন উজাড়, ভূ গর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার, নদী ও জলাশয় শুকিয়ে যাওয়া। খরার ফলে যেসব প্রভাব পড়ে  কৃষি উৎপাদন কমে যায়, খাদ্যসংকট ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়, পানীয় জলের তীব্র সংকট দেখা দেয়, গবাদিপশু ও বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মানুষের স্বাস্থ্যঝুকি ও অপুষ্টি বৃদ্ধি পায়, পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় ও মরুকরণের ঝুকি বাড়ে। এছাড়াও খরা মোকাবিলার উপায় সম্পর্কে ধারণা থাকতে হবে  বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করা, বৃক্ষরোপন ও বন সংরক্ষণ করা, সেচের পানির সাশ্রয়ী  ব্যবহার নিশ্চিত করা, খরাসহিষ্ঞু ফসলের চাষ বৃদ্ধি করা, নদী, খাল ও জলাশয় সংরক্ষণ করা, জলবায়ুর পরিবর্তনের প্রভাব কমাতে পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ গ্রহণ করা, খরাপ্রবণ এলাকায় সরকারি সহায়তা ও সচেতনতা বৃদ্ধি করা। খরার ক্ষতি কমাতে সরকার, কৃষক এবং সাধারণ মানুষকে একযোগে কাজ করতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদের সঠিক ব্যবহার, পানি সংরক্ষণ এবং পরিবেশ রক্ষার মাধ্যমে খরার ক্ষতিকর প্রভাব অনেকাংশে কমানো সম্ভব। 

কৃষির ওপর প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব

বাংলাদেশের কৃষি প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ কৃষির সাথে জড়িত হওয়ায় দুর্যোগের প্রভাব কৃষক ও সামগ্রিক অর্থনীতিতেও পড়ে। অতিরিক্ত বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি  ফসলের শিকর ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। নদীভাঙনে কৃষি জমি বিলীন হয়ে কৃষকরা জমি হারান। উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে কৃষি জমি ও ফসলের ক্ষতি করতে পারে। অতিরিক্ত পানি জমে ধান, সবজি ও অন্যান্য ফসলের ক্ষেত তলিয়ে যায় এবং ফসল নষ্ট হয়। বড় ধরনের দুর্যোগে ফসলের উৎপাদান কমে গেলে  স্থানীয় খাদ্য সরবরাহে চাপ সৃষ্টি হতে পারে। 

অতিবৃষ্টি

অতিবৃষ্টি হলো অল্প সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেশি বৃষ্টিপাত হওয়া। বাংলাদেশে বর্ষাকালে অতিবৃষ্টির কারণে বিভিন্ন অঞ্চলে  জলাবদ্ধতা, বন্যা ও নদীর পানি বৃদ্ধি পেতে পারে। এর ফলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কৃষি ও অবকাঠামোর ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। এটি একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ, যা বন্যা, জলাবদ্ধতা, ভূমিধস এবং জনজীবনে নানা ধরনের দুর্যোগ সৃষ্টি করে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও অতিবৃষ্টির ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে। কৃষিপ্রধান দেশে অতিবৃষ্টির ক্ষতিকর দিক কম নয়। বাংলাদেশে প্রায় বছরই অতিবৃষ্টি দেখা দেয়। অতিবৃষ্টির ফলে ফসলের জমি পানিতে ডুবে যায় এবং জমি থেকে পানি নিষ্কাশন দেরিতে হয়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। মৌসুমি বায়ুর অতিরিক্ত সক্রিয়তা। গভীর নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাব। উষ্ঞতা বৃদ্ধি ও বায়ুমন্ডলে  জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বেড়ে যাওয়া। অতিবৃষ্টির ফলে যেসব প্রভাব ফেলে  বন্যা ও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ফসলের অনেক ক্ষতি হয়। ঘরবাড়ি, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকায়। বিশুদ্ধ পানির সংকট ও পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষা, যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক কার্যক্রম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিবৃষ্টি মোকাবিলারও উপায় রয়েছে কার্যকর ড্রেনেজ ও পানি  নিষ্কাশন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। নদী, খাল ও জলাশয় দখলমুক্ত এবং নিয়মিত খনন করা। আবহাওয়ার পূর্বাভাস অনুসরণ করে আগাম প্রস্তুতি নেওয়া। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা। বৃক্ষরোপণ ও পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া। দুর্যেোগ পরবর্তী ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা। সরকার ও জনগনের সম্মিলিত উদ্যোগই অতিবৃষ্টি  মোকাবিলার প্রধান উপায়। 

শিলাবৃষ্টি

শিলাবৃষ্টি হলো এমন একটি প্রাকৃতিক ঘটনা, যেখানে বৃষ্টির সঙ্গে বরফের ছোট বা বড় গোলাকার খন্ড আকাশ থেকে পড়ে যা শিলা নামে পরিচিত। এটি মূলত বজ্রঝড় বা কালবৈশাখীর সময় ঘটে। বাংলাদেশে সাধারণত কালবৈশাখী ও বজ্রঝড়ের সময় শিলাবৃষ্টি হতে দেখা যায়। শিলাবৃষ্টি অল্পস্থায়ী হলেও কৃষি, সম্পদ ও মানুষের জীবনে অনেক ক্ষয়ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে ইরি ধানের মৌসুমে শিলাবৃষ্টি হলে কৃষকের দুঃখ, দুর্দশার সীমা থাকে না। চারা অবস্থায় শিলাবৃষ্টি হলে ধানের ফসল অনেক কম হয়। ধান বের হবার পরে শিলাবৃষ্টি হলে ধান চিটা হয় এবং ঝরে যায়। যেসব কারণে শিলাবৃষ্টি হয় তা হলো  বজ্রগর্ভ  মেঘে শক্তিশালী উর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ সৃষ্টি হওয়া। মেঘের উপরের অত্যন্ত ঠান্ডা স্তরে পানির ফোটা জমে বরফে পরিণত হওয়া। বারবার বরফের স্তর জমে বড় আকারের শিলা তৈরি হওয়া। শিলার ওজন বেড়ে গেলে তা মাটিতে পড়ে যায়। শিলাবৃষ্টির প্রভাবে যেসব ক্ষয়ক্ষতি হয় তা হলো ধান, গম, ভুট্টা, আম, লিচুসহ বিভিন্ন ফসলের অনেক ক্ষতি হয়। গাছপালা ও ফলমূল নষ্ট হয়ে যায়। ঘরবাড়ির টিনের ছাদ, জানালা ও যানবাহনের ক্ষতি হতে পারে। মানুষ ও গবাদিপশু আহত হতে পারে। কৃষকের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় এবং খাদ্য উৎপাদনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শিলাবৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমাদের কয়েকটি উপায় মেনে চলতে হবে।  আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত অনুসরণ করা। শিলাবৃষ্টির সময় নিরাপদ ভবনের ভিতরে আশ্রয় নেওয়া। গবাদিপশুকে নিরাপদ স্থানে রাখা। কৃষিজমিতে প্রয়োজনে সুরক্ষামূলক জাল বা অন্যান্য ব্যবস্থা ব্যবহার করা। দুর্যেোগ পরবর্তী ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের দ্রুত সহায়তা ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা দরকার। সচেতনতা, আগাম সতর্কবার্তা এবং যথাযথ প্রস্তুতির মাধ্যমে শিলাবৃষ্টির ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। 

বন্যা

বন্যা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান প্রাকৃতিক দুর্যোগ। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত, উজান থেকে নেমে আসা পানি, নদ নদীর পানি বৃদ্ধি এবং পানি নিষ্কাশনের দুর্বলতার কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষ করে বর্ষাকালে নদী তীরবর্তী  ও নিম্নাঞ্চলের মানুষ বন্যার ঝুকিতে থাকে। প্রতিবছর বাংলাদেশ বন্যায় প্লাবিত হয়। ঋতুগত কারণে নদ নদীর পানি বেরে যায়, বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ি ঢল নেমে, নদীর বাধ ভাঙে, জলোচ্ছ্বাস ও জোয়ারের ফলে বাংলাদেশে বন্যা দেখা দেয়। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো অঞ্চলে বন্যা দেখা যায়। বন্যা হওয়ার অনেকগুলো কারণ রয়েছে  অতিবৃষ্টি ও দীর্ঘস্থায়ী বর্ষণ। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল। নদীর পানি ধারণক্ষমতা কম। নদী ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়া। জলবায়ু পবিবর্তনের প্রভাব। অপরিকল্পিত নগরায়ন ও দুর্বল পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা। বন্যার ফলে অনেক ক্ষতির প্রভাবের ফলে ঘরবাড়ি, রাস্তা, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষিজমি ও ফসল নষ্ট হয়ে খাদ্য উৎপাদন কমে যায়। মানুষ ও গবাদিপশুর প্রাণহানি ঘটতে পারে।  শিক্ষা, যোগাযোগ, ব্যবসা বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিশুদ্ধ পানির সংকট এবং ডায়রিয়া, কলেরা, টাইফয়েডসহ পানিবাহিত রোগের প্রকোপ বাড়ে। দরিদ্র মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বন্যা মোকাবিলার উপায় সম্পর্কে জানা থাকতে হবে বন্যা মোকাবিলার উপায়গুলো হলো  নদী, খাল ও জলাশয়ের নিয়মিত খনন এবং রক্ষণাবেক্ষণ করা। শক্তিশালী বাধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা। আবহাওয়া ও বন্যার আগাম সতর্কবার্তা অনুসরণ করা। বন্যাপ্রবণ এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র ও ত্রাণব্যবস্থা উন্নত করা। বৃক্ষরোপণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণে গুরুত্ব দেওয়া। দুর্যোগ পরবর্তী পুনর্বাসন ও কৃষকদের  সহায়তা নিশ্চিত করা। সরকার বিভিন্ন সংস্থা এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই বন্যা মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায়। 

 নদীভাঙন

নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক দুর্যোগ।  নদীর স্রোত, অতিরিক্ত পানি, বন্যা ও নদীর গতিপথ পরিবর্তনের কারণে নদীর তীরের মাটি ধীরে ধীরে বা হঠাৎ করে ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। দেশের বিভিন্ন নদী তীরবর্তী এলাকায় নদীভাঙনের ঘটনা দেখা যায়।  নদীভাঙন বাংলাদেশের একটি অন্যতম ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা, তিস্তা ও ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর তীরবর্তী এলাকায়  নদীভাঙনের ঘটনা বেশি দেখা যায়। নদীর তীব্র স্রোত, বন্যা এবং পলি জমার পরিবর্তনের কারণে নদীর তীর ভেঙে যায়। এর ফলে প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ ঘরবাড়ি, জমিজমা হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেসব কারণে নদী ভাঙনের সৃষ্টি হয় তা হলো নদীর তীব্র স্রোত ও বন্যা। অতিবৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল। নদীর গতিপথের পরিবর্তন। নদীতল ও তীরের মাটির দুর্বলতা।  জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব। অপরিকল্পিত বাধ নির্মাণ ও নদী ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি। নদীভাঙনের ফলে যেসব ক্ষতি দেখা দেয় তা হলো  ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হয়। কৃষি উৎপাদন কমে যায় এবং খাদ্যসংকট দেখা দিতে পারে। সড়ক, সেতু ও অন্যান্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দারিদ্র, বেকারত্ব ও সামাজিক সমস্যা বৃদ্ধি পায়। স্থানীয় অর্থনীতি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নদীভাঙন প্রতিরোধের উপায়ও রয়েছে এগুলো হলো  নদীর তীর সংরক্ষণে টেকসই বাধ ও ব্লক নির্মাণ করা। নদী খনন ও সুষ্ঠু নদী ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা। নদীতীরবর্তী এলাকায় পরিকল্পিত বসতি গড়ে তোলা। আগাম সতর্কতা ও ঝুকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া। পরিবেশ সংরক্ষণ এবং নদীতীরে বৃক্ষরোপণ করা। নদীভাঙনের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা, কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা, পুনর্বাসন কর্মসূচি এবং জনগনের সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি।  

আশ্রয়কেন্দ্র ও উদ্ধার কার্যক্রম

প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় মানুষের জীবন রক্ষায় আশ্রয়কেন্দ্র ‍উদ্ধার কার্যক্রম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা বা জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগের পূর্ভাবাস পাওয়া  গেলে ঝুকিপূর্ণ এলাকার মানুষকে  দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া হয়। আশ্রয়কেন্দ্রে নারী, শিশু, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তির জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা  ও সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা দরকার। সেখানে বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, ওষুধ, স্যানিটেশন ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা থাকা গুরুত্বপূর্ণ। দুর্যোগের সময় প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল নৌকা, লাইফ জ্যাকেট, দড়ি ও অন্যান্য সরঞ্জাম ব্যবহার করে আটকে পড়া মানুষকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যায়। 

ভূমিকম্প

ভূমিকম্প হলো পৃথিবীর ভূত্বকের অভ্যন্তরে সঞ্চিত শক্তি হঠাৎ মুক্ত হয়ে ভূপৃষ্ঠে  কম্পন সৃষ্টি হওয়ার প্রাকৃতিক ঘটনা। এটি একটি আকস্মিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ  এবং অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে পারে। বাংলাদেশ ভূমিকম্পন এলাকার কাছাকাছি  অবস্থিত হওয়ায় এ দেশেরও ভূমিকম্পের ঝুকি রয়েছে। এটি পৃথিবীর সবচেয়ে বয়াভহ প্রাকৃতিক দুর্যেোগগুলোর একটি। ভূমিকম্পেন ফলে মানুষের জীবন, সম্পদ ও অবকাঠামোর অনেক ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। যেসব কারণে ভূমিকম্প সৃষ্টি হয় তা হলো  টেকনোটিক প্লেটের সংঘর্ষ, সরে যাওয়া বা একে অপরের নিচে ঢুকে যাওয়া। ভূত্বকের ফাটল বরাবর আকস্মিক নড়াচড়া। আগ্নেয়গিরির অগ্নুৎপাত। ভূগর্ভস্থ বিস্ফোরণ বা খননকাজের মতো মানবসৃষ্ট কিছু কার্যক্রম। ভূমিকম্পের কারণে যেসব ক্ষতি হয় সেগুলো হলো  ঘরবাড়ি, সেতু, সড়ক ও অন্যান্য স্থাপনা ধসে পড়তে পারে। মানুষের প্রাণহানি ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও যোগাযোগ ব্যবস্থা  ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অগ্নিকান্ড, ভূমিধস এবং কিছুক্ষেত্রে সুনামির মতো দুর্যোগ ঘটতে পারে। অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভূমিকম্পের সময় যেসব কাজগুলো করতে হবে তা হলো  ভূমিকম্পের সময় আতঙ্কিত না হয়ে শান্ত থাকার চেষ্টা করতে হবে। ভবনের ভেতরে  থাকলে শক্ত টেবিল বা মজবুত আসবাবের নিচে আশ্রয় নিতে হবে এবং মাথা ও ঘাড় রক্ষা করতে হবে। লিফট ব্যবহার করা যাবে না। বাইরে থাকলে ভবন, বৈদ্যুতিক খুটি ও বড় গাছ থেকে দূরে খোলা জায়গায় অবস্থান করতে হবে। কম্পন থেমে গেলে নিরাপদ স্থানে সরে যেতে হবে এবং প্রয়োজনে জরুরি সেবা  সহযোগিতা নিতে হবে।  

ভারত কর্তৃক সৃষ্ট সমস্যা

প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রভাব ফেলতে পারে এমন কিছু বিষয় ভারতের সঙ্গে সম্পর্কিত বলে বিভিন্ন সময়ে আলোচনা হয়। অনেকের মতে, বাংলাদেশে ভয়াবহ বন্যার অন্যতম কারণ ফারাক্কা বাধ। ভারত উজানের সবকটি নদীতে বাধ নির্মাণ করে  পানি প্রত্যাহার করায় নদীতে প্রবাহ হ্রাস পেয়ে পলি পড়ে। ফলে নদীর নাব্যতা হ্রাস পায়। অপরদিকে বর্ষা মৌসুমে সবকটি বাধ খুলে দেয়। এতে নদীর প্রবাহ মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পায়, যা নিয়ন্ত্রণ করা নদীগুলোর জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে ফলে বন্যা হয়। যেসব কারণে ভারতকর্তৃক সৃষ্ট সমস্যাগুলো হয় তা হলো গঙ্গা, তিস্তা ও অন্যান্য আন্তঃসীমান্ত নদীর উজানে পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে পানির প্রবাহ কমে যেতে পারে। এতে খরা, সেচ সংকট ও কৃষিতে নেতিবাচক প্রভাব পরতে পারে। ভারী বর্ষার সময় উজানের অতিরিক্ত পানি বা বাধ থেকে  পানি ছাড়া হলে   বাংলাদেশের নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে, এমন অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে ওঠে। তবে নির্দিষ্ট কোনো বন্যার ক্ষেত্রে এর ভূমিকা কতটা ছিল, তা পরিস্থিতিভেদে ভিন্ন এবং প্রাকৃতিক বৃষ্টিপাতও বড় কারণ হতে পারে। নদীর প্রবাহের পরিবর্তনের কারণে সীমান্তবর্তী কিছু এলাকায় নদীভাঙ্গনের ঝুকি বাড়তে পারে, যা বসতভিটা ও কৃষিজমির ক্ষতি করে। আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি প্রবাহে পরিবর্তন হলে জলাভূমি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ভারত কর্তৃক সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের উপায়ও রয়েছে এগুলো হলো আন্তঃসীমান্ত নদীর পানি বন্টনে ন্যায্য ও টেকসই চুক্তি করা। বন্যা ও পানি ব্যবস্থাপনায় দুই দেশের মধ্যে তথ্য আদান প্রদান বৃদ্ধি করা। যৌথ নদী কমিশনের কার্যক্রম আরও কার্যকর করা। বিজ্ঞানভিত্তিক নদী ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশ সংরক্ষণে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা।  

দুর্যোগ মোকাবিলার উপায়

বাংলাদেশে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন, অতিবৃষ্টি, শিলাবৃষ্টি ও ভূমিকম্পের মতো বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটে। প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পরিকল্পিত প্রস্তুতি,সচেতনতা এবং দ্রুত পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।   বিভিন্ন উপায়ে বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করা যায়। দুর্যোগ মোকাবিলার প্রধান প্রধান উপায়গুলো  হলো দুর্যোগ মোকাবিলার জন্য প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কর্মীবাহিনী গঠন করা। জাতীয় ভিত্তিতে দুর্যোগ মোকাবিলা করার নীতিমালা,পরিকল্পনা ও কর্মপদ্ধতি প্রদান করা। জাতীয় ও স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন সংস্থার কার্যক্রমের মধ্যে যোগাযোগ ও সময়ের ব্যবস্থা করা। পরীক্ষিত পদ্ধতির ভিত্তিতে যথাসময়ে সতর্কবাণী  দেওয়ার ব্যবস্থা করা। দুর্যোগ ঘটার পর দ্রুত ক্ষয়ক্ষতি ও চাহিদা নিরূপনের ব্যবস্থা করা। তথ্য সরবরাহের ব্যবস্থাকে উন্নত করা। দুর্যোগপূর্ণ এলাকাতে আশ্রয়স্থল গড়ে তোলা। বেসামরিক ও সামরিক বাহিনীকে কাজে লাগানো। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাসমূহকে কাজে লাগানো। সামাজিক ও সংস্কৃতিক সংগঠনকে কাজ করার সুযোগ দানের ব্যবস্থা করা। শিক্ষার মাধ্যমে গণসচেতনতা সৃষ্টি করা। আবহাওয়া ও দুর্যোগের পূর্ভাবাসদ্রুত মানুষের কাছে পৌছে দেওয়া।  ঘূর্ণিঝড় ও বন্যাপ্রবণ এলাকায় আশ্রয়কেন্দ্র নিমার্ণ ও রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। প্রশিক্ষিত উদ্ধারকারী দল, নৌযান ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখতে হবে। দুর্যোগের আগে, সময় ও পরে কী করণীয় তা মানুষকে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। দুর্যোগের সময়ের জন্য নিরাপদ পানি, শুকনো খাবার, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংরক্ষণ করা দরকার। ঘরবাড়ি, সড়ক, সেতু ও অন্যান্য স্থাপনা দুর্যোগের ঝুকি বিবেচনা করে নিমার্ণ করতে হবে। গাছ লাগানো, বন রক্ষা ও জলাভূমি সংরক্ষণ প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব কমাতে সাহায্য করে। ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে দ্রুত খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তা দিতে হবে। 

বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সম্পদ, কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতির ওপর অনেক প্রভাব ফেলতে পারে। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা, অতিবৃষ্টি ও ভূমিকম্পের মতো দুর্যোগ পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তবে সঠিক পরিকল্পনা, আগাম সতর্কবার্তা, জনসচেতনতা ও কার্যকর দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে  এর ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। দুর্যোগের আগে ঝুকিপূর্ণ মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া, প্রয়োজনীয় খাদ্য ও ওষুধ মজবুত রাখা এবং উদ্ধারকারী দলকে প্রস্তুত রাখা জরুরি। একই সাথে দুর্যোগ সহনশীল ঘরবাড়ি ও অবকাঠামো নিমার্ণ, নদী ও জলাধার সংরক্ষণ, বনায়ন এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্ব দিতে হবে। দুর্যোগের পর ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের দ্রুত উদ্ধার, চিকিৎসা, খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবি সংগঠন এবং  সাধারণ জনগণের  সম্মিলিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি শিশু কিশোরসহ সব শ্রেণির মানুষকে দুর্যোগ মোকাবিলার বিষয়ে সচেতন ও প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার, আধুনিক পূর্ভাবাস ব্যবস্থা এবং মানুষের সচেতন অংশগ্রহণের মাধ্যমে বাংলাদেশ আরও দুর্যোগসহনশীল দেশ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে। প্রাকৃতিক দুর্যোগকে ভয় না পেয়ে প্রস্তুতি, সচেতনতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমে দুর্যোগের মোকাবিলা করাই হতে পারে নিরাপদ ও টেকসই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পথ।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url