বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত।

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ একটি দেশ। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অনেক সম্ভাবনা রয়েছে। কক্সবাজারের দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, কুয়াকাটা, রাতারগুল, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড় ও ঝর্ণা এবং বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনা দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। পর্যটন শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ একটি শাখা। এই খাতে দেশটি দ্রুত উন্নতি করছে এবং  অনেক বিদেশি পর্যটক বাংলাদেশে আগ্রহী হয়ে উঠছে। সুন্দর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতি ও ঐতিহাসিক স্থান পর্যটনের মূল আকর্ষণ। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতির একটি সম্ভাবনাময় সেবা খাত। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন, পাহাড়, সমুদ্র, বনভূমি, নদী এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে দেশটি দেশি বিদেশি পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয়। বাংলাদেশের পর্যটন ক্ষেত্রের অন্যতম শক্তি হলো বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত, চট্টগ্রামের পাহাড় ও নদী এসব স্থান দেশের পর্যটকদের জন্য অত্যন্ত প্রিয়। বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন আকর্ষণের মধ্যে বিভিন্ন স্থান রয়েছে। কক্সবাজারের বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত। সুন্দরবন যা বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন এবং রয়েল বেঙ্গল টাইগারের আবাসস্থল। 

সাজেক ভ্যালি, বান্দরবান ও রাঙ্গামাটির পাহাড়ি সৌন্দর্য। মহাস্থানগড়, পাহাড়পুর বৌদ্ধবিহার এবং ষাট গম্বুজ মসজিদের মতো ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান। সিলেটের চা বাগান, রাতারগুল সোয়াম্প ফরেস্ট ও জাফলং। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের অনেক গুরুত্ব রয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে সহায়তা করে। স্থানীয় অর্থনীতি ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের বিকাশে রাখে।  হোটেল, রেস্তোরা, পরিবহন ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পকে আরও এগিয়ে নিতে পর্যটন কেন্দ্রগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা ও আধুনিক সেবার মান উন্নয়ন করা প্রয়োজন। পাশাপাশি পরিবেশ ও জীব বৈচিত্র্য রক্ষা করে টেকসই পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সরকার ও পর্যটনকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত হিসেবে উন্নয়নের উদ্যোগ নিয়েছে। উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা গেলে বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প ভবিষ্যতে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থানে আরও বড় অবদান রাখতে পারে। 

সুন্দরবন

সুন্দরবন বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রাকৃতিক সম্পদ এবং বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বনভূমি। এটি দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত এবং এর একটি অংশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও বিস্তৃত। নদী, খাল, বন ও বৈচিত্র্যময় প্রাণীর সমন্বয়ে সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ অনেক আকর্ষণীয়। বাংলাদেশের উপকূলবর্তী অঞ্চলে ৬ হাজার বর্গকিলোমিটারের  অধিক জায়গা জুড়ে সুন্দরবন অবস্থিত। এটি পৃথিবীর বৃহত্তম মেনগ্রোভ বনাঞ্চল। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও বরগুণা  জেলায় এর অবস্থান। সুন্দরী বৃক্ষ, গোলপাতাসহ নানা জাতের উদ্ভিদ এবং চিত্রল হরিণ, বাঘ, বানর, হনুমানসহ নানা জাতের পশুপাখির আবাস এই সুন্দরবনে। অভ্যন্তরে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য খালে রয়েছে কুমির। রোমাঞ্চপ্রিয় পর্যটকগণ নৌযানে করে সুন্দরবনের সৌন্দর্য উপভোগ করতে যেতে পারেন। ভয় ও ভালো লাগার অপূর্ব মিশেলের কারণে সুন্দরবন ভ্রমণ যেকোনো পর্যটকের স্মৃতিতে স্থায়ী হয়ে থাকবে। 

সুন্দরবনের বৈশিষ্ট্য

১. এটি বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন।
২. বনটির অসংখ্য নদী, খাল ও জলপথ রয়েছে। 
৩. প্রধান গাছের মধ্যে সুন্দরী, গেওয়া, গরান ও কেওড়া উল্লেখযোগ্য। 
৪. সুন্দরী গাছের নাম থেকেই সুন্দরবন নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। 

সুন্দরবনের  জীববৈচিত্র্য

১. রয়েল বেঙ্গল টাইগার।
২. চিত্রা হরিণ।
৩. লোনা পানির কুমির।
৪. বানর।
৫. অজগর ও বিভিন্ন প্রজাতির সাপ।
৬. শতাধিক প্রজাতির মাছ, পাখি ও অন্যান্য বন্যপ্রাণী।

সুন্দরবনের অর্থনৈতিক গুরুত্ব

১, মধু, মোম, মাছ ও কাকড়ার গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
২. উপকূলীয় মানুষের জীবিকা নির্বাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে এবং পর্যটন শিল্পে অবদান রাখে। 

সিলেটের রাতারগুল

সিলেটের রাতারগুল জলাবন বাংলাদেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র। সিলেট জেলার ঘোয়াইনঘাটে অবস্থিত রাতারগুল জলাবন বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির বন। এর আয়তন ৩ হাজার ৩২৫ একর। ১০ ফুট গভীর পানির উপর বনের গাছপালা জেগে থাকে। রাতারগুলের প্রধান আকর্ষণগুলো হলো রাতারগুলের নিরিবিলি পরিবেশ। বর্ষাকালে নৌকায় করে বনের ভেতর ঘুরে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। পর্যটকগনকে  নৌকায় করে বনের মধ্যে প্রবেশ করতে দেখা যায়। বর্ষাকালে বনটির অধিকাংশ অংশ পানিতে তলিয়ে যায়, ফলে নৌকায় ভ্রমণ করে এর অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়।  এখানে উপভোগ করার মতো আছে কদম, হিজল, অর্জুন, ছাতিম প্রভৃতি গাছের সুন্দর্য। বেড়াতে বেড়াতে দেখা যায় বানর, বেজি, গুইসাপ, কিংবা সাদা বক, মাছরাঙা, পানকৌড়ি প্রভৃতি প্রাণী ও পাখির সঙ্গে।

রাতারগুলের বৈশিষ্ট্য

১. এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মিঠাপানির জলাবন।
২. বর্ষাকালে গাছের গোড়া থেকে অনেকটা অংশ পানিতে ডুবে থাকে। 
৩. নৌকা ভ্রমণ রাতারগুলের প্রধান আকর্ষণ।
৪. ছোট ছোট খাল ও জলপথ বনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে।

 রাতারগুলের  জীববৈচিত্র্য

১. করচ, হিজলসহ জলসহিষ্ঞু গাছপালা।
২. মাছ, সাপ, ব্যাঙ ও বিভিন্ন জলজপ্রাণী।
৩. নানা প্রজাতির দেশিয় ও পরিযায়ী পাখি।

 রাতারগুলের পর্যটন গুরুত্ব

১. দেশি বিদেশি পর্যটকদের কাছে এটি একটি জনপ্রিয় স্থান।
২. স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও পর্যটন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. প্রকৃতিপ্রেমী, আলোকচিত্রী ও পর্যটন অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

সমুদ্র সৈকত

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে সমুদ্র সৈকত একটি গুরুত্বপূর্ণ আকর্ষণ। দেশের দীর্ঘ উপকূল জুড়ে বিস্তৃত সমুদ্র, ঢেউ, বালুকাবেলা ও সূর্যোদয় সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। কক্সবাজার জেলায় অবস্থিত কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত পৃথিবীর দীর্ঘতম (১২০ কিলোমিটার দীর্ঘ) প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত। সমুদ্র সৈকত হলো সমুদ্রের তীরবর্তী বালুকাময় বা পাথুরে এলাকা, যেখানে ঢেউ এসে আছরে পড়ে। সমুদ্র সৈকত প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এক অপূর্ব নিদর্শন এবং এটি পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ।  সমুদ্র সৈকতের সৌন্দর্য  উপভোগ করতে পর্যটকরা ভির করেন কক্সবাজারে। সমুদ্র ছাড়াও কক্সবাজার জেলায় রয়েছে একাধিক ক্ষুদ্র জাতিসত্তার ধর্মীয় উপাসনালয় ও বৌদ্ধ মূর্তি। স্থাপত্যশিল্পের বিচারে এগুলো অমূল্য। এছাড়া চট্টগ্রামের পতেঙ্গা, কক্সবাজারের ইনানি, পটুয়াখালির কুয়াকাটা, সুন্দরবনের কটকা প্রভৃতি সমুদ্র সৈকতে ভ্রমণপিপাসুরা বেড়াতে যান।

বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্র সৈকত 

১. কক্সবাজার বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র সৈকত হিসেবে পরিচিত।
২. একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখার জন্য কুয়াকাটা বিখ্যাত।
৩. প্রবাল পাথর ও স্বচ্ছ পানির জন্য ইনানি সমুদ্র সৈকত জনপ্রিয়। 
৪. সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ, যা নীল সমুদ্র ও মনোরম পরিবেশের জন্য সুপরিচিত।

 সমুদ্র সৈকতের গুরুত্ব

১. প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ ও মানসিক প্রশান্তি লাভের সুযোগ দেয়।
২. দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে।
৩. পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৪. স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করে।

সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন

সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দেশের দীর্ঘ সমুদ্র উপকূল, বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা, নীল জলরাশি এবং মনোরম সূর্যোদয় সূর্যাস্ত পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিশেষ করে কক্সবাজার, কুয়াকাটা ও সেন্ট মার্টিন সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের জন্য উল্লেখযোগ্য স্থান। সমুদ্রকে কেন্দ্র করে নৌভ্রমণ, সৈকতে অবকাশযাপন, সূর্যাস্ত উপভোগ এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক কার্যক্রম পর্যটকদের আনন্দ দেয়। সমুদ্রভিত্তিক পর্যটনের  উন্নয়নের জন্য পর্যটকদের নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, যোগাযোগ ব্যবস্থা ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব উদ্যোগের মাধ্যমে সমুদ্রভিত্তিক পর্যটন দেশের অর্থনীতি ও পর্যটন শিল্পে আরও অবদান রাখতে পারে। 

সেন্ট মার্টিন

সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ এবং দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটনকেন্দ্র। বাংলাদেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত সেন্টমার্টিন দ্বীপ বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ। এটি কক্সবাজার জেলার টেকনাফ উপজেলা থেকে প্রায় ৯ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। সমস্ত  দ্বীপ জুড়ে   রয়েছে নারিকেল গাছ। দ্বীপ থেকে সমুদ্রের নীল জলরাশির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এবং নানা রকমের প্রবাল দেখতে পর্যটকরা সেন্টমার্টিন দ্বীপে ভ্রমণ করেন। নীল সমুদ্র, প্রবাল সাদা বালুর সৈকতে এবং নারকেল গাছের সারির জন্য সেন্টমার্টিন দেশি বিদেশি পর্যটকদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। দ্বীপটির প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অতিরিক্ত পর্যটন, প্লাস্টিক বর্জ্য ও পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করে পরিকল্পিত ও পরিবেশবান্ধব পর্যটন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। 

সেন্টমার্টিনের বৈশিষ্ট্য

১. এটি বাংলাদেশের একমাত্র প্রাকৃতিক প্রবাল দ্বীপ।
২. দ্বীপটি  “নারকেল জিঞ্জিরা” নামেও পরিচিত।
৩. চারদিকে স্বচ্ছ নীল পানি ও মনোরম সমুদ্র সৈকত রয়েছে।
৪. সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের অপরূপ দৃশ্য  পর্যটকদের মুগ্ধ  করে। 

সেন্টমার্টিনের  জীববৈচিত্র্য

সেন্টমার্টিনে রয়েছে সমৃদ্ধ সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য। এখানে দেখা যায় বিভিন্ন সামুদ্রিক প্রানী।  
১. প্রবাল প্রাচীর।
২. বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক মাছ।
৩. কাকড়া, ঝিনুক ও শামুক।
৪. নানা প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণী।

 সেন্টমার্টিনের পর্যটন গুরুত্ব

১. প্রতি বছর হাজার হাজার দেশি বিদেশি পর্যটক এখানে ভ্রমণ করেন।
২. সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।
৩. পর্যটনের মাধ্যমে স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ব্যবসার সুযােগ সৃষ্টি হয়েছে। 

পার্বত্য অঞ্চল

বাংলাদেশের পার্বত্য জেলাসমূহ অর্থাৎ রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাক্ষেত্র। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চল দেশের  দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি মনোরম পাহাড়ি এলাকা। এই অঞ্চলে তিনটি জেলা রয়েছে বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি। একদিকে সুউচ্চ পাহাড়ের চূড়ায় উঠে মেঘ ছোয়ার আনন্দ, অন্যদিকে প্রাকৃতিক জলের উৎস ঝর্ণাধারা পর্যটকদের অভিভূত করে। রাঙামাটির কাপ্তাই  হ্রদে নৌকায় ভেসে বেড়ানো যায়। হ্রদের উপরে একটি সুদৃশ্য ঝুলন্ত সেতু রয়েছে। খাগড়াছড়ি জেলার অন্তর্গত আলুটিলা পাহাড়, ঝরণা, মায়াবিনী লেক প্রভৃতি স্থানে ভ্রমণের হাতছানি পর্যটকরা অগ্রাহ্য করতে পারে না। সিলেটের জাফলংয়ের পিয়াইন নদীতে মনোমুগ্ধকর পাথুরে জলের ধারা, মৌলভীবাজারের মাধবকুন্ড ঝরনা, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও পঞ্চগড়ের চা বাগান, শ্রীমঙ্গলের  ইকোপার্ক প্রভৃতি স্থান প্রায় সারাবছরই পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত থাকে।

পার্বত্য অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য

১. উচু নিচু পাহাড় ও সবুজ অরণ্যে ঘেরা।
২. মনোরম আবহাওয়া ও শান্ত পরিবেশ ভ্রমণপ্রেমিদের আকর্ষণ করে।
৩. অসংখ্য ঝরনা, নদী ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ।
৪. বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য রয়েছে। 

পার্বত্য অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান

১. মেঘ, পাহাড় ও সবুজ প্রকৃতির জন্য সাজেক ভ্যালি বিখ্যাত।
২. নীণগিরি বান্দরবানের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র।
৩. দেশের অন্যতম  উচ্চ পর্বতশৃঙ্গ হিসেবে কেওক্রাডং পরিচিত।
৪. কাপ্তাই হ্রদ হলো বাংলাদেশের বৃহত্তম কৃত্রিম হ্রদ।

পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও পর্যটন গুরুত্ব

১. পর্যটন শিল্পের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
২. স্থানীয় মানুষের কর্মসংস্থান ও ক্ষুদ্র ব্যবসার সুযোগ সৃষ্টি করে।
৩. ফল, বাঁশ, কাঠ এবং হস্তশিল্প উৎপাদনে এ অঞ্চলের অবদান রয়েছে। 

পুরাকীর্তি

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পুরাকীর্তি হলো অতীতের সভ্যতা, সংস্কৃতি, স্থাপত্য ও ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন, যা একটি জাতির ঐতিহ্য বহন করে। এগুলো আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবনধারা, শিল্পকলা, ধর্মীয় বিশ্বাস ও প্রযুক্তিগত দক্ষতার পরিচয় দেয়। বাংলাদেশের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর রয়েছে ঐতিহাসিক গুরুত্ব। পুরান ঢাকার লালবাগে অবস্থিত মুঘল স্থাপত্য লালবাগ কেল্লা, বুড়িগঙ্গার তীরে নির্মিত আহসান মঞ্জিল, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাও এ গড়ে ওঠা অনুপম স্থাপত্য শৈলীবিশিষ্ট পানাম নগর, কুমিল্লায় আবিষ্কৃত প্রাচীন নগর ময়নামতি, বগুরার প্রাচীন পুরাকীর্তি মহাস্থানগড়, নওয়াগা জেলার আবিষ্কৃত পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বৌদ্ধবিহার পাহাড়পুর, বাগেরহাটের ষাটগম্বুজ মসজিদসহ বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রয়েছে প্রাচীন ও আধুনিক স্থাপত্যকলার বহু নিদর্শন। বাংলাদেশে অসংখ্য মূল্যবান পুরাকীর্তি রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো  প্রাচীন বৌদ্ধ সভ্যতার অন্যতম নিদর্শন  এবং ইউনেস্কো বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হলো পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার। মহাস্থানগড়  বাংলাদেশের প্রাচীনতম প্রত্নতাত্ত্বিক নগরগুলোর একটি। সুলতানি আমলের অনন্য স্থাপত্যকীর্তি  এবং বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থান হলো ষাট গম্বুজ মসজিদ।মুঘল আমলের ঐতিহাসিক দুর্গ হলো লালবাগ কেল্লা। দেশি বিদেশি পর্যটকরা এসব ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন করে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে পারেন। ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। পুরাকীর্তি আমাদের ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণে সহায়তা করে। পর্যটকদের আগমনে স্থানীয়  ব্যবসা বাণিজ্য ও পর্যটনসেবা সম্প্রসারিত হয়। বাংলাদেশের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো বিশ্ব পর্যায়ে দেশের পরিচিতি বাড়াতে ভূমিকা রাখে। 

বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, পাহাড়, নদী, পুরাকীর্তি, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করার বড় সুযোগ সৃষ্টি করে। বিদেশি পর্যটকদের আগমন বাড়লে হোটেল, রেস্তোরা, পরিবহন, গাইড, হস্তশিল্প ও  স্থানীয় ব্যবসার প্রসার ঘটতে পারে। ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দেশের অর্থনীতিতে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সুযোগও বাড়ে। সুন্দরবন, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, রাতারগুল ও পার্বত্য অঞ্চলের সৌন্দর্য বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করতে পারে। ওয়েবসাইট, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও অনলাইন ভিডিওর মাধ্যমে বাংলাদেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো বিশ্ববাসীর কাছে সহজে তুলে ধরা যায়। 

ঐতিহাসিক স্থাপনা

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর গুরুত্ব অনেক। এসব স্থাপনা দেশের প্রাচীন ইতিহাস, ঐতিহ্য, স্থাপত্য ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে। দেশ বিদেশি পর্যটকেরা এসব স্থান পরিদর্শনের মাধ্যমে বাংলাদেশের অতীত সম্পর্কে জানতে পারেন। ঐতিহাসিক স্থাপনা হলো এমন সব ভবন, দুর্গ, মসজিদ, মন্দির, প্রাসাদ, যা অতিতের ইতিহাস সংস্কৃতি ও সভ্যতার গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য বহন করে। এগুলো একটি জাতির ঐতিহ্য, গৌরব ও পরিচয়ের প্রতীক। ১৯৫২ সালে সংঘটিত ভাষা আন্দোলনের শহিদদের স্মরণে ঢাকা মেডিকেল প্রাঙ্গণে স্থাপিত কেন্দ্রীয় শহিদ মিনার, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের শহিদদের প্রতি নিবেদিত ও ঢাকার সাভারে অবস্থিত জাতীয় স্মৃতিসৌধ, ঢাকার সাহবাগে অবস্থিত জাতীয় জাদুঘর, ১৯৭১ সালের ১৪ই ডিসেম্বর নিহত বুদ্ধিজীবিদের স্মরণে ঢাকার মিরপুরে নির্মিত বুদ্ধিজীবি স্মৃতিসৌধ, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এবং এই উদ্যানে স্থাপিত স্বাধীনতা জাদুঘর ইতিহাসপ্রেমি পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। বাংলাদেশে বিখ্যাত অনেক ঐতিহাসিক স্থাপনা রয়েছে। এগুলো হলো  লালবাগ কেল্লা মুঘল আমলের একটি ঐতিহাসিক দুর্গ। মহাস্থানগড় প্রাচীন বাংলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নগর। আহসান মঞ্জিল ঢাকার নবাবদের ঐতিহাসিক প্রাসাদ। পাহাড়পুর বৌদ্ধ বিহার প্রাচীন বৌদ্ধ শিক্ষা ও সংস্কৃতির এক অনন্য নিদর্শন। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে এগুলোর ভূমিকা আরও বিস্তৃতভাবে বলা যায়। ঐতিহাসিক স্থাপনা থেকে দেশের অতীত ও বিভিন্ন সময়ের সভ্যতা সম্পর্কে জানা যায়।  এসব স্থাপনায় প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী নির্মাণশৈলীর নিদর্শণ দেখা যায়। ঐতিহাসিক স্থানগুলো বাংলাদেশের প্রতি  বিদেশি পর্যটকদের আগ্রহ বাড়াতে পারে। এসব স্থাপনা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আধুনিক প্রযুক্তি ও সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমের মাধ্যমে ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরা যায়। 

 বাংলাদেশে পর্যটন শিল্পের অবস্থা

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ দুই দিকই রয়েছে। দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, পাহাড়, নদী, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি পর্যটনের জন্য বড় সম্পদ। বাংলাদেশে পর্যটন শিল্প একটি সম্ভাবনাময় অর্থনৈতিক খাত। দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্শন করে। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবন, সেন্টমার্টিন, সিলেটের চা বাগান ও রাতারগুল, পার্বত্য চট্টগ্রাম এবং পাহাড়পুরের মতো স্থানগুলো বাংলাদেশের পর্যটনের প্রধান আকর্ষণ। পর্যটন বিশ্বব্যাপী একটি সম্ভাবনাময় খাত। বিভিন্ন পরিসংখ্যানে জানা যায়, বিশ্বজুড়ে পর্যটকদের সম্মিলিত বার্ষক ভ্রমণ ব্যয় ৫০ হাজার কোটি টাকা। এমন অনেক দেশ রয়েছে যার প্রধান আয়ের উৎস পর্যটন। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দিনে দিনে বিকাশ লাভ করছে। একদিকে বিদেশি পর্যটকদের আগমণ দেশের বৈদেশিক মুদ্রার সঞ্চয় বাড়িয়ে তুলছে, অন্যদিকে দেশীয় পর্যটকদের ভ্রমণ সামগ্রীক অর্থনীতিতে  ইতিবাচক প্রভাব ফেলছে। পরিবহণ, আবাসিক হোটেল , রেস্তোরা, পোশাক, অলংকার প্রভৃতি ব্যবসায় পর্যটন শিল্পের বিকাশে অসংখ্য মানুষের জীবিকারও সংস্থান হয়। বর্তমানে প্রায় ১২ লক্ষ মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পর্যটন শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। অর্থনীতিবিদগন মনে করেন, পর্যটন শিল্প থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত জিডিপি অর্জন করা সম্ভব। বর্তমানে অভ্যন্তরীণ পর্যটন ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং পর্যটন শিল্প কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন ও স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। সরকার ও পর্যটন খাতকে আরও সম্প্রসারণের জন্য জিডিপিতে এর অবদান উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। 

পর্যটন শিল্পের বিকাশে করণীয়

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশের জন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও  সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে হবে। পর্যটকদের নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় ভ্রমণ নিশ্চিত করার পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন করা জরুরি। পৃথিবীব্যাপী পর্যটন শিল্প এখন দ্রুত বিকাশ লাভ করছে। বাংলাদেশে কয়েকটি বিষয়ের প্রতি নজর দিলে পর্যটন এলাকাগুলোতে পর্যটকদের যাতায়াত বাড়বে। প্রথমেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত যাতায়াত ব্যবস্থার দিকে। উন্নত পথ ও যানবাহনের ব্যবস্থা না থাকলে পর্যটকরা নিরুৎসাহিত হবেন এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশে পার্বত্য অঞ্চলসহ বেশকিছু পর্যটনকেন্দ্র গুলোতে সবধরনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা করা জরুরি। পর্যটকরা যাতে নির্ভয়ে ও নিঃসঙ্কোচে ভ্রমণ করতে পারে তার নিশ্চয়তা থাকতে হবে। অতিরিক্ত ভ্রমণ ব্যয় পর্যটকদের ভ্রমণে  নিরুৎসাহিত করে। তাই যাতায়াত এবং থাকা খাওয়াসহ সংশ্লিষ্ট ব্যয় যাতে সীমার মধ্যে থাকে তা বিবেচনায় নেওয়া উচিত। পর্যটন শিল্পের  বিকাশে যেসব কাজ করতে হবে তা হলো পর্যটন এলাকায় উন্নত সড়ক, বিমানবন্দর, হোটেল, রিসোর্ট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। দেশি বিদেশি পর্যটকদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। সমুদ্রসৈকত, বনাঞ্চল, পাহাড় ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকে দূষণ ও অবৈধ দখল থেকে রক্ষা করতে হবে।বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণগুলোকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ডিজিটাল মাধ্যম, পর্যটন মেলা এবং প্রচারণার মাধ্যমে তুলে ধরতে হবে। হোটেল, রেস্তোরা, পরিবহন ও ট্যুর গাইডদের সেবার মান উন্নত করতে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা উচিত। পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করতে হবে। পর্যটন কেন্দ্রীক এলাকায় স্থানীয় মানুষকে পর্যটন কার্যক্রমে যুক্ত করলে তাদের আয় বাড়বে এবং পর্যটনও টেকসই হবে। দেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে নতুন পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট ও বিনোদন সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। 

আন্তর্জাতিক পরিচিতি

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিতি লাভ করছে।  প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদী নালা, সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, বনভূমি, ঐতিহাসিক স্থাপনা, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন এবং বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি  বাংলাদেশের পর্যটনকে বিশেষ বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষের জীবনযাত্রা নতুন অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করে। বাংলাদেশের কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত বিশ্বের দীর্ঘতম প্রাকৃতিক  বালুকাময় সমুদ্র সৈকতগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত। বিশাল সমুদ্র, দীর্ঘ বালুকাবেলা এবং সূর্যোদয় সূর্যাস্তের মনোরম দৃশ্য দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করে। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ  বন হিসেবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, নদী খাল, রয়েল বেঙ্গল টাইগার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশ বিদেশি পর্যটকদের কাছে বিশেষ আগ্রহের বিষয়। সেন্ট মার্টিন দ্বীপ, পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ি অঞ্চল, সিলেটের চা বাগান, রাতারগুল জলাবন, নদীমাতৃক বাংলাদেশের গ্রামীণ পরিবেশ পর্যটনের আন্তর্জাতিক পরিসরকে আরও সমৃদ্ধ করেছে। পাহাড়, সমুদ্র ও বনের বৈচিত্র্য বাংলাদেশের পর্যটনকে একক কোনো ধরনের ভ্রমণের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। বাংলাদেশের সৃস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্য আন্তর্জাতিক পর্যটনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পহেলা বৈশাখ, লোকসংগীত, নকশিকাথা, মৃৎশিল্প, জামদানি, বাউল সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার এবং গ্রামীণ জীবনযাত্রা বিদেশি পর্যটকদের কাছে বাংলাদেশের স্বতন্ত্র পরিচয় তুলে ধরতে পারে। আন্তর্জাতিক পরিচিতি আরও বাড়ানোর জন্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করা, দক্ষ পর্যটনকর্মী তৈরি, সহজ ভ্রমণসেবা, বহুভাষিক তথ্য ব্যবস্থা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কার্যকর প্রচার প্রচারণা গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ডিজিটাল ফ্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বাংলাদেশের পর্যটন আকর্ষণগুলো বিশ্বের মানুষের কাছে সহজে তুলে ধরা সম্ভব। 

পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব

বাংলাদেশ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, নদ নদী, সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, বনভূমি, ঐতিহাসিক স্থাপনা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিতে সমৃদ্ধ। এসব সম্পদকে কেন্দ্র করে পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একটি দেশের পর্যটন শিল্প বিকশিত হলে সেই দেশের সংস্কৃতিও সমৃদ্ধ হয়। পর্যটন এলাকায় অধিবাসিদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়। মানুষের অর্থনৈতিক উন্নতি ত্বরান্বিত হয়। পর্যটকদের আগ্রহ রয়েছে এমন স্থান, স্থাপনা বা বিষয়ের প্রতি স্থানীয় অধিবাসিদেরও শ্রদ্ধাশীল করে তুলে। পর্যটন শিল্প একটি দেশের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাত। বাংলাদেশের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও ঐতিহাসিক সমৃদ্ধ দেশে পর্যটন শিল্পের গুরুত্ব দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। পর্যটন শিল্পের প্রধান গুরুত্বগুলো হলো পর্যটকদের ভ্রমণ, থাকা, খাওয়া ও কেনাকাটার মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন খাতে অর্থের প্রভাব এবং অর্থনীতি গতিশীল হয়। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারলে তাদের ব্যয়ের মাধ্যমে দেশে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন পর্যটনের আকর্ষণ হওয়ায় এগুলো সংরক্ষণের প্রতি গুরুত্ব বাড়ে। বিদেশি পর্যটকরা বাংলাদেশের  সৌন্দর্য ও সংস্কৃতির সাথে  পরিচিত হলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে দেশের পরিচিত ও ভাবমূর্তি আরও বিস্তৃত হতে পারে। পর্যটনের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয় এবং দেশের অর্থনীতি শক্তিশালী হয়। পর্যটকদের আগমনে স্থানীয় পণ্য, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র ব্যবসার বিকাশ ঘটে। হোটেল, রেস্তোরা, ট্যুর, গাইড, হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হয়। দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য বিশ্বের কাছে পরিচিত হয়। বিদেশি পর্যটকদের আগমনের মাধ্যমে বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও পারস্পরিক বোঝাপড়া বৃদ্ধি পায়। পর্যটনকেন্দ্রীয় এলাকায় সড়ক, যোগাযোগ ব্যবস্থা, আবাসন ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধার উন্নয়ন ঘটে। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে পর্যটন পরিচালিত হলে প্রাকৃতিক ও ঐতিহাসিক সম্পদ সম্প্রসারণের গুরুত্ব বাড়ে।

ভবিষ্যৎ সম্ভাবণা

বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অত্যন্ত বিস্তৃত। দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক নিদর্শন, সমুদ্র সৈকত, পাহাড়, বনাঞ্চল নদ নদী ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে পরিকল্পিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে  পর্যটন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হতে পারে। দেশের সুন্দরবন, কক্সবাজার, সেন্ট মার্টিন, পার্বত্য চট্টগ্রাম, রাতারগুল, হাওরাঞ্চল ও বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনা দেশি বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণ করার বড় সুযোগ তৈরি করে। ভবিষ্যতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার পর্যটন ব্যবস্থাকে আরও সহজ করতে পারে। অনলাইন হোটেল বুকিং, ডিজিটাল টিকিট, ভার্চুয়াল ট্যুর, অনলাইন পর্যটন তথ্য ও ডিজিটাল মানচিত্রের মাধ্যমে পর্যটকরা সহজেই ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে পারবেন। বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। সঠিক পরিকল্পনা ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার করলে বাংলাদেশ পর্যটন ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানে পৌছাতে পারবে। বিশেষ করে ইকো ট্যুরিজম ও সাংস্কৃতিক পর্যটন খাত বিকাশের অনেক সুযোগ রয়েছে। দেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, ঐতিহাসিক স্থাপনা, সমৃদ্ধ সংস্কৃতি এবং আতিথেয়তার কারণে এই খাত আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে হতে পারে। ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার প্রধান দিকগুলো হলো বিদেশি পর্যটকদের সংখ্যা বাড়লে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। সুন্দরবন, রাতারগুল সোয়াম ফরেস্ট এবং পার্বত্য অঞ্চলে  পরিবেশবান্ধব পর্যটনের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে উন্নত সড়ক, বিমানবন্দর, হোটেল ও পর্যটন সেবা গড়ে উঠলে পর্যটন শিল্প আরও দ্রুত বিকশিত হবে। হোটেল, রিসোর্ট, পরিবহন, ট্যুর গাইড, রেস্তোরা ও হস্তশিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। দেশি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করে নতুন পর্যটনকেন্দ্র, রিসোর্ট ও বিনোদন সুবিধা গড়ে তুলতে হবে। পুরাকীর্তি ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা করতে হবে পর্যটনকেন্দ্রীক এলাকায় স্থানীয় মানুষকে পর্যটন কার্যক্রমে যুক্ত করলে তাদের আয় বাড়বে এবং পর্যটনও টেকসই হবে।             

বাংলাদেশের পর্যটন শিল্প দেশের অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও আন্তর্জাতিক পরিচিত বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, দীর্ঘ সমুদ্র সৈকত, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, পাহাড়, ঝর্ণা, নদী হাওর, চা বাগান, ঐতিহাসিক স্থাপনা এবং বৈচিত্র্যময় লোকজ সংস্কৃতি বাংলাদেশের পর্যটনকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। এসব আকর্ষণ দেশি বিদেশি পর্যটকদের নতুন অভিজ্ঞতা লাভের সুযোগ সৃষ্টি করে এবং বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের সৌন্দর্য ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে সহায়তা করে। পর্যটন শিল্পের সুষ্ঠু বিকাশ হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্থানীয় ব্যবসা বাণিজ্যের প্রসার, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন এবং বিভিন্ন অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হতে পারে। একই সাথে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর উন্নয়ন স্থানীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি  পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোর সংরক্ষণেও বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন পর্যটন পরিবেশ, উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, মানসম্মত আবাসন, দক্ষ পর্যটনকর্মী, সহজ তথ্যসেবা এবং আধুনিক প্রচার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। দেশের পর্যটন সম্পদকে পরিকল্পিতভাবে সংরক্ষণ ও বিশ্বব্যাপী তুলে ধরতে পারলে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক পর্যটন পরিচিতি আরও বিস্তৃত হতে পারে।
Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url