প্রকৃতির সকল দান মিলেমিশে তৈরি হয় পরিবেশ। আমাদের চারিদিকে রয়েছে গাছপালা, নদ-নদী, পাহাড় পর্বত, পথঘাট, পশুপাখি প্রভৃতি। সুস্থ ও সুন্দর জীবনের জন্য এগুলো সহায়ক। আকাশ, বাতাস, জল, উদ্ভিদজগত, প্রাণীজগত সবকিছুই আমাদের পরিবেশ। এগুলোর কোনোটাই বাদ দিয়ে আমরা বাচতে পারি না। কিন্তু বর্তমানে আমরা আমাদের স্বার্থের কারণে পরিবেশ নানান ভাবে দূষিত করে থাকি। জল, বায়ু, মাটি দূষণের ফলে নানা রকমের রোগ সৃষ্টি হচ্ছে, এছাড়াও বন্যা অনাবৃষ্টি দেখা দিচ্ছে।প্রকৃতির এসব উপকরণের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যখন বাধা প্রদান করি, তখন পরিবেশ খারাপ হয়ে ওঠে। প্রকৃতি কখনও পরিবেশ দূষণ করে না। আমরাই পরিবেশ দূষণের জন্য দায়ী। সারা পৃথিবী জুড়ে ঘনিয়ে আসছে পরিবেশ সংকট। মানুষের সৃষ্টের যন্ত্রসভ্যতার গোড়াপত্তন থেকেই চলেছে প্রাকৃতিক পরিবেশের ওপর মানুষের নির্মম কুঠারাঘাত। ফলে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। মারাত্মক পানিদূষণ ও বায়ুদূষণ নিয়ে পরিবেশ বিজ্ঞানীরা আজ উদ্বিগ্ন। এ থেকে মুক্তির উপায় নিয়ে চলছে নানা গবেষণা। এ ব্যাপারে ব্যাপক জনসচেতনা সৃষ্টির লক্ষ্যে জাতিসংঘ ৫ই জুনকে ঘোষণা করেছে বিশ্ব পরিবেশ দিবস। মানুষসহ পৃথিবীর সকল মানুষের জন্য পরিবেশ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশই হলো প্রাণের ধারক। পরিবেশের ওপর নির্ভর করে মানুষ বা অন্য যেকোনো উদ্ভিদ বা প্রাণীর জীবনের উদ্ভব ও বিকাশ ঘটে।

সে পরিবেশ যদি কোনো কারণে দূষিত হয় তবে তা জীবের অস্তিত্বের জন্য হুমকিস্বরূপ।পরিবেশ দূষণ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুতর সমস্যা। মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ডের ফলে বায়ু, পানি, মাটি ও শব্দের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়াকেই পরিবেশ দূষণ বলা হয়। শিল্পকারখানার ধোয়া, যানবাহনের কালো ধোয়া, প্লাস্টিক ও পলিথিন, নদীতে বর্জ্য ফেলা, বন উজার এবং অতিরিক্ত কীটনাশক ব্যবহারের কারণে পরিবেশ দূষণ দিন দিন বাড়ছে। পরিবেশ দূষণের ফলে মানুষের বিভিন্ন রোগ বৃদ্ধি পায়, জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, মাটি ও পানির গুণগতমান নষ্ট হয় এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি বাড়ে। বায়ুদূষণ মানুষের শ্বাসকষ্টসহ নানা স্বাস্থ্যঝুকি তৈরি করে। পরিবেশ সুস্থ থাকলেই মানুষ ও অন্যান্য জীবের জীবন নিরাপদ থাকবে। পরিবেশের সঙ্গে মিলেমিশে মানুষ বা অপরাপর প্রাণীর জীবনের বিকাশ ঘটে। জীবজগত ও তার পরিবেশের মধ্যে বেচে থাকার উপকরনের আদান প্রদান চলে। আদান প্রদানের ভারসাম্যের ওপর জীবের অস্তিত্ব নির্ভরশীল।
পরিবেশ দূষণ কী
পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে যখন বায়ু, পানি, মাটি, শব্দ ও জীবজগতের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, তখন তাকে পরিবেশ দূষণ বলা হয়। মানুষের বিভিন্ন কর্মকান্ড শিল্পকারখানার ধোয়া এবং বর্জ্য, যানবাহনের ধোয়া, প্লাস্টিক পলিথিনের ব্যবহার, নদী খালে ময়লা ফেলা এবং নির্বিচারে গাছ কাটা পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ। সাময়িক লাভের আশায় মানুষ পরিবেশকে নানাভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। অতিমাত্রায় প্রকৃতি থেকে বিভিন্ন বস্তু সংগ্রহ করার কারণে ও অতিমাত্রায় অর্থ উপার্জন করার মানসিকতা পরিবেশকে দূষিত করছে। প্রাকৃতিক কারণে অথবা মানুষের কার্যকলাপে সৃষ্ট উদ্ভুত দূষিত পদার্থ যখন পরিবেশকে বিষময় করে তুলে তখনই আমরা দূষণ শব্দটা ব্যবহার করি। পরিবেশের প্রাকৃতিক বিভিন্ন উপাদান যেমন মাটি, পানি, বায়ু ইত্যাদির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব পরিবর্তন ঘটলে তা জীবজগতের উপর ক্ষতিকর প্রভাব সৃষ্টি করে। অর্থাৎ পরিবেশ নানাভাবে ব্যবহার করার কারণে পরিবেশের বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটে। এই পরিবর্তন যখন আমাদের জন্য ক্ষতির কারণ হয় তখন তোকে পরিবেশ দূষণ বলা হয়। মানুষ প্রতিনিয়ত কলকারখানার বর্জ্য ও নানান আবর্জনা ফেলে নদী, নালা, খাল বিল এমনকি সমুদ্রের পানিকেও দূষিত করে চলেছে। কলকারখানা, গাড়ি ও ইটের ভাটার ধোয়া বায়ুকে দূষিত করছে। পরিবেশ দূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য, প্রাণী ও উদ্ভিদ, কৃষি, পানি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যহীনতাও বাড়তে থাকে। সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিশ্চিত করতে পরিবেশ দূষণ নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত জরুরি।
পরিবেশ দূষণের শ্রেণি
পরিবেশ দূষণ প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম দুই ভাবেই হতে পারে। প্রাকৃতিক দূষণের মধ্যে রয়েছে সীসা, পারদ, সালফার ডাই অক্সাইড, কার্বন ডাই অক্সাইড, কার্বন মনো অক্সাইড ইত্যাদি। এর মধ্যে কতগুলো আবার আমাদের মলমূত্র ও শরীরের পচন থেকে উৎপন্ন। তার ওপর আছে কৃত্রিম দূষকের সমস্যা। কৃত্রিম দূষকের অন্তর্গত হলো নানা কীটনাশক, গুড়ো সাবান, ওষুধপত্র ও প্রসাধন সামগ্রী, প্লাস্টিক। এসব যৌগের কয়েকটি আমাদের পরিবেশে বহুদিন ধরে টিকে থাকে। রোদ, জল, বাতাস, জীবাণু এদের কোনো ক্ষতিই করতে পারে না। এ ধরনের যৌগ পরিবেশের জন্য বেশি হুমকি। কেননা কিছু দিন আগেও পৃথিবীর বুকে এ ধরনের যৌগের অস্তিত্ব ছিল না। যেসব কারণে পরিবেশ দূষণ হয় তা হলো কলকারখানা ও যানবাহনের ধোয়া, ইট ভাটার ধোয়া এবং ক্ষতিকর গ্যাসের কারণে বায়ু দূষিত হয়। এতে শ্বাসকষ্ট ও নানা রোগ হতে পারে। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, প্লাস্টিক ও শিল্পবর্জ্য, মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে। শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য, প্লাস্টিক ও রাসায়নিক পদার্থ নদী, খাল, বিল, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানিতে মিশে পানি দূষণ ঘটায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত কৃত্রিম আলো রাতের স্বাভাবিক অন্ধকার নষ্ট করে এবং মানুষ ও প্রাণীর স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। যানবাহনের হর্ন, মাইক, নির্মাণ কাজ ও কলকারখানার অতিরিক্ত শব্দ থেকে শব্দদূষণ সৃষ্টি হয়। এটি শ্রবণশক্তি ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলতে পারে। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেজস্ক্রিয় বর্জ্য বা পারমানবিক দুর্ঘটনা থেকে তেজস্ক্রিয় দূষণ ঘটতে পারে। এটি মানুষ ও জীবজগতের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।
বায়ু দূষণ ও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া
আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদের প্রধানতম উপাদান হলো বায়ু। সেই বায়ুদূষণ আজ সারা বিশ্বজুড়ে। ক্ষতিকারক পদার্থ বাতাসে মেশার ফলে বায়ুদূষণ হয়। বায়ুদূষণ হলো বায়ুমন্ডলে ধোয়া, ধূলিকণা, বিষাক্ত গ্যাস ও অন্যান্য ক্ষতিকর পদার্থের পরিমাণ স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে যাওয়াকে বোঝায়। কলকারখানার ধোয়া, যানবাহনের কালো ধোয়া, ইট ভাটা, বন উজার, আবর্জনা পোড়ানো এবং জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের কারণে বায়ুদূষণ সৃষ্টি হয়। কার্বন কণা থেকে শুরু করে ভারী ধাতু, জটিল জৈব যৌগ নিউক্লিয় আবর্জনা, জীবাশ্ম জ্বালানি অর্থাৎ তেল, কয়লা ইত্যাদি পুড়িয়ে কার্বন ডাই অক্সাইড বাতাসে ছড়িয়ে দেওয়া, রাসায়নিক ধোয়া ইত্যাদি হলো বায়ু দূষণকারী দ্রব্য। বাতাসে কার্বন ডাই অক্সাইডের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এরফলে পৃথিবীতে তাপমাত্রা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। কুয়াশা আর তেল, কয়লা দহনের ফলে নির্গত গ্যাসের মিশ্রণে ধোয়াশার সৃষ্টি। এর ক্ষতিকারক ক্ষমতা মারাত্মক। মাথাধরা, শ্বাসকষ্ট, হাপানি, ফুসফুস ক্যান্সার এ জাতীয় দূষণের ফল। এছাড়া আরও এক ধরনের বায়ুদূষক বাতাসে ছড়িয়ে থাকে। এগুলো হলো বেসে বেড়ানো জীবাণু। অ্যালার্জিজনিত রোগে ঐসব জীবাণু সবচেয়ে বেশি দায়ি। বায়ুদূষণের বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া হলো বায়ুদূষণের ফলে শ্বাসকষ্ট, কাশি, হাপানি ও ফুসফুসের বিভিন্ন রোগ হতে পারে। দীর্ঘদিন দূষিত বায়ুতে বসবাস করলে হৃদরোগ ও স্ট্রোকের ঝুকি বাড়তে পারে। ধোয়া ও ধূলিকণার কারণে চোখ জ্বালা, নাক দিয়ে পানি পড়া ও অস্বস্তি দেখা দেয়। দূষিত বায়ু শিশুদের ফুসফুসের স্বাভাবিক বিকাশে বাধা সৃষ্টি করতে পারে। কার্বন ডাই অক্সাইডসহ বিভিন্ন গ্রিনহাউজ গ্যাস বৈশ্বিক উষ্ঞায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। কিছু বায়ুদূষক গ্যাস বৃষ্টির পানির সঙ্গে মিশে অ্যাসিড বৃষ্টির সৃষ্টি করতে পারে, যা মাটি, পানি, উদ্ভিদ ও স্থাপনার ক্ষতি করতে পারে। বায়ুদূষণের কারণে উদ্ভিদ ও প্রাণীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয় এবং বিভিন্ন প্রজাতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত বায়ুদূষণ উদ্ভিদের বৃদ্ধি ও ফসলের উৎপাদনশীলতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।ধোয়া ও সূক্ষ্ম ধূলিকণার কারণে কুয়াশার মতো আবরণ তৈরি হয়ে যান চলাচলে সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে।
পরিবেশ দূষণের শুরু
মানব সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে পরিবেশ দূষণের শুরু। মানুষ শিখলো আগুন জ্বালাতে, বন কেটে করল বসত। সেই সঙ্গে সভ্যতার বিচিত্র্য বিকাশের প্রক্রিয়ায় পরিবেশ হতে থাকল দূষিত। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নয়নে শুরু হলো নতুন যুগের নতুন সভ্যতার। শুরু হলো নগর জীবনের, গড়ে উঠল অসংখ্য কারখানা, যানবাহনের দেখা দিল পথে পথে, সবুজ বিপ্লব ঘটাতে এলো কীটনাশক। আণবিক ও পারমাণবিক বোমার তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে গেল আকাশে বাতাসে। ফলে পরিবেশ দূষণ দেখা দিল ব্যাপকভাবে।
পানি দূষণ ও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া
পানি দূষণ হলো মানুষের কার্যকলাপের ফলে জলাশয়ে দূষণ ঘটা। স্বাভাবিক পরিবেশে পানিতে দূষণকারী পদার্থ উপস্থিত থাকলে তাকে পানি দূষণ বলে। পৃথিবীর সমুদ্র, নদ নদী, পুকুর, খাল বিল ইত্যাদির পানি নানাভাবে দূষিত হচ্ছে। ভারী ধাতু, কার্বন ডাই অক্সাইড, পেট্রোলিয়াম,কৃত্রিম তেজস্ত্রিয় পদার্থ, শহরের ড্রেন বেয়ে আসা দূষিত তরল আবর্জনা এগুলোই পানি দূষণের প্রধান কারণ। তা ছাড়া নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে আধুনিক পাটকল, কাপড়কল, কয়লা ধোলাই কল, চিনি কল, কাগজের কল, ভেষজ তেল তৈরি কারখানা, চামরা পাকা করার কারখানা ইত্যাদি। এসব কলকারখানার আবর্জনা প্রতিনিয়ত নদ নদীকে দূষিত করছে। পুকুর, খাল বিল দূষণের জন্যে নালা নর্দমা, ঘর বাড়ির আবর্জনা ইত্যাদি দায়ি। এর থেকেই দূষিত হয় মাটি ও পানি। এর ফলে নানা ধরনের রোগেরও সৃষ্টি হয়। পানি দূষণের প্রতিক্রিয়াগুলো হলো দূষিত পানি পান করলে ডায়রিযা, কলেরা, আমাশয়, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন রোগ হতে পারে। পানিতে বিষাক্ত পদার্থ ও অতিরিক্ত বর্জ্য মিশলে মাছসহ বিভিন্ন জলজ প্রাণী মারা যায়। পানি দূষণের ফলে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয় এবং জীববৈচিত্র্য কমে যায়। নদী, পুকুর ও ভূগর্ভস্থ পানি দূষিত হলে নিরাপদ পানির প্রাপ্যতা কমে যায়। দূষিত পানি দিয়ে সেচ দিলে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হতে পারে এবং কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দূষিত পানিতে মাছের প্রজনন ও বেচে থাকার পরিবেশ নষ্ট হয়। পচা বর্জ্য ও নোংরা পদার্থ পানিতে মিশে দুর্গন্ধ সৃষ্টি করে। মৎস, কৃষি, পর্যটন ও পানিনির্ভর বিভিন্ন কর্মকান্ড ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। শব্দ দূষণ ও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া পানি দূষণের কারণে খাদ্যশৃঙ্খল ও সামগ্রিক পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিতহয়।
শব্দ দূষণ ও বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া
শব্দ
দূষণ হলো অতিরিক্ত, বিরক্তকর,
ক্ষতিকর শব্দের কারণে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ও পরিবেশের ওপর
বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হওয়া। শব্দের প্রভাবে জীবের শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি
হয় বলে একে শব্দ
দূষণ বলে। শব্দ দূষণ
নাগরিক সভ্যতার অভিশাপ। শহরাঞ্চলে শব্দ দূষণের মূল উৎসগুলো
হচ্ছে মোটরগাড়ির হর্ন, বাজি ও পটকার
আওয়াজ, রেডিও, টেলিভিশনের আওয়াজ, মাইকের আওয়াজ, কলকারখানার শব্দ ইত্যাদি। শব্দ
দূষণের পরিণাম শ্রবণেন্দ্রিয় অকেজো হয়ে যাওয়া, হৃদযন্ত্রের
ক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাওয়া,
স্নায়ুতন্ত্রের ওপর চাপ পড়ে
অনিদ্রা এবং নানাপ্রকার স্নায়ুরোদের
সৃষ্টি হওয়া। এছাড়া কলকারখানার আশেপাশের স্থায়ী বাসিন্দারা বধির হয়ে যায়।
বর্তমানে শহরাঞ্চলে শব্দ দূষণ একটি
গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা।
শব্দ দূষণের প্রধান কারণগুলো হলো
- যানবাহনের হর্ন ও ইঞ্জিনের অতিরিক্ত শব্দ।
- কলকারখানার যানবাহনের অতিরিক্ত শব্দ।
- নির্মাণ কাজ ও ভারী যন্ত্রপাতির শব্দ।
- রেলগাড়ি ও বিমান চলাচলের শব্দ।
- মাইক, লাউডস্পিকার ও উচ্চ শব্দে গান বাজানো।
- সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অতিরিক্ত শব্দ সৃষ্টি।
শব্দ দূষণের ক্ষতিকর প্রভাবগুলো হলো
- শ্রবণশক্তি হ্রাস পেতে পারে।
- ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে।
- মনোযোগ ও কর্মদক্ষতা কমে যায়।
- মাথাব্যথা, বিরক্তি ও মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়।
- উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদযন্ত্রের সমস্যার ঝুকি বাড়তে পারে।
- শিশুদের পড়াশোনা ও মানসিক বিকাশে নেতিবাচত প্রভাব ফেলে।
- পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
মৃত্রিকা দূষণ
মৃত্রিকা তথা মাটি দূষণ বলতে রাসায়নিক বর্জ্যের নিক্ষেপ কিংবা ভূ গর্ভস্থ ফাটলের কারণে নিঃসৃত বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থের মিশ্রণের কারণে জমির উর্বরতা শক্তি নষ্ট হওয়াকে বোঝায়। ভূমিক্ষয়, বায়ু প্রবাহ, বৃষ্টি, গাছকাটা, বনউজার, জমিতে অতিরিক্ত বা নিয়মিত রাসায়নিক সার ব্যবহার করা ইত্যাদির কারণে মাটির গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়, ফলে মৃত্রিকা দূষণ হয়।
মৃত্রিকা দূষণের প্রধান কারণগুলো হলো
- অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার।
- শিল্পকারখানার বর্জ্য মাটিতে ফেলা।
- পলিথিন ও প্লাস্টিকের স্তূপ জমা হওয়া।
- হাসপাতাল ও গৃহস্থালির বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা।
- অপরিকল্পিত নগরায়ন ও নির্মাণবর্জ্য।
- বিভিন্ন বিষাক্ত রাসায়নিক পদার্থ মাটিতে মিশে যাওয়া।
মৃত্রিকা দূষণের প্রতিক্রিয়াগুলো হলো
- মাটির উর্বরতা কমে যায়।
- ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মান হ্রাস পায়।
- মাটির উপকারি জীবাণু ও কেচো ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- জীববৈচিত্র্য ু পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।
- ভূ গর্ভস্থ পানি দূষিত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ে।
- বিষাক্ত পদার্থ খাদ্যশৃঙ্খলে প্রবেশ করে মানুষের স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে।
পরিবেশ দূষণের কারণ
নানান কারণে পরিবেশ দূষিত হয়। তবে মূল কারণগুলি হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও শিল্পায়ন, জনসংখ্যার ব্যাপক বৃদ্ধি এবং বৃক্ষ ও বনভূমির অপরিকল্পিত ব্যবহার। পরিবেশ দূষণের আরেকটি কারণ পৃথিবীর বুকে জনবসতি বৃদ্ধি। এর ফলে সীমিত প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর চাহিদার চাপ পড়েছে প্রচন্ডভাবে। ভূমিতে বৃদ্ধি পাচ্ছে চাষের তীব্রতা, কীটনাশক ও কৃত্রিম সারের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে বিনষ্ট হচ্ছে চাষযোগ্য ভূমির সঞ্জিবনী শক্তি, অন্যদিকে নতুন নতুন বসতি ও কলকারখানার স্থাপনার মধ্য দিয়ে ক্রমে হ্রাস পাচ্ছে চাষযোগ্য ভূমি ও বনভূমি। কারখানার কালো ধোয়া আর বিষাক্ত গ্যাস নির্গমনের পাশাপাশি রাসায়নিক শিল্প কারখানা থেকে প্রতিদিন নদী, হ্রদ, সমুদ্রে মিশছে বিপুল পরিমাণ বিষাক্ত বর্জ্যদ্রব্য। মাটি, পানি, বাতাস এবং আমাদের চারপাশের উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতের ওপর বিষক্রিয়ার প্রভাবে প্রাকৃতিক পরিবেশ হয়ে উঠছে ভারসাম্যহীন দূষিত ও প্রাণীজগতের জন্য হুমকি সরূপ। কারখানা থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস ও রাসায়নিক বর্জ্য বায়ু ও পানি দূষিত করছে। গাড়ি, বাস, ট্রাক ও মোটর সাইকেলের ধোয়া বায়ু দূষণের অন্যতম কারণ। অতিরিক্ত গাছ কাটার ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং বায়ু মন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড বৃদ্ধি পায়। প্লাস্টিক ও পলিথিন ফেলার কারণে মাটি, পানি ও জলজ পরিবেশ দূষিত হয়। আবর্জনা, পচা খাবার ও নোংরা পানি অপরিকল্পিতভাবে ফেললে পরিবেশ দূষিত হয়। কীটনাশক ও রাসায়নিক সার মাটি ও পানির গুণমান নষ্ট করে। শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য ও ময়লা পানিতে ফেলার কারণে জলাশয় দূষিত হয়। অপরিকল্পিত বাড়িঘর, রাস্তা ও শিল্প স্থাপণের ফলে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। ইটভাটা থেকে নির্গত ধোয়া ও ক্ষতিকর কণা বায়ু দূষণ করে। যানবাহনের হর্ন, নির্মাণ কাজ, মাইক ও শিল্পকারখানার উচ্চ শব্দ পরিবেশ ও মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। অপরিকল্পিতভাবে সম্পদ আহরণ করলে মাটি, পানি ও জীববৈচিত্র্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে বর্জ্য ও সম্পদের ব্যবহার বাড়ছে, অসচেতনতার কারণে দূষণ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জনসংখ্যা বিস্ফোরণ
জনসংখ্যা বিস্ফোরণ বলতেকোনো দেশ বা অঞ্চলে স্বাভাবিক হারের তুলনায় অতিরিক্ত দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়াকে বোঝায়। সীমিত সম্পদ ও সুযোগের তুলনায় জনসংখ্যা বেশি বেড়ে গেলে খাদ্য, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়। জনসংখ্যা বিস্ফোরণ পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ। একটি জরিপে দেখা গেছে ৮০০ খ্রিস্টাব্দে যেখানে পৃথিবীর জনসংখ্যা ছিল ১০০ কোটি, সেখানে ২০১২ সালে তা প্রায় ৭০০ কোটিতে দাড়িয়েছে। ক্রমবর্ধান জনসংখ্যা বিস্ফোরণের এই চাপে পরিবেশ দূষিত হচ্ছে।
পারমাণবিক প্রক্রিয়া ও পরিবেশ দূষণ
বিশ শতকের মাঝামাঝি থেকে শুরু হয়েছে পারমাণবিক যুগ। কাঠ, কয়লা এবং তেল দহনের ফলে বায়ুমন্ডল যে পরিমাণে দূষিত হয়, পারমাণবিক দহনে দূষণের পরিমাণ তার চেয়ে বহুগুণ বেশি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষের দিকে পারমাণবিক বোমাবর্ষণের ফলে শুধু জাপানের হিরোশিমা নাগাসাকিই ধ্বংস হয়নি, তার প্রবল প্রতিক্রিয়া সন্নিহিত ভূখন্ডের মানুষ, জীবজন্তু এবং উদ্ভিদের অস্তিত্বও বিপন্ন হয়ে পড়ে। পরীক্ষামূলকভাবে পারমাণবিক বোমা বিস্ফোরণের ফলে বায়ুমন্ডলকে যে পরিমাণে বিষাক্ত করে তোলা হয়, বায়ুমন্ডলকে সেই পরিমাণে বিষমুক্ত করে তার পরিশোধনের বিন্দুমাত্র প্রয়াস নেই। তাছাড়া প্রচন্ড শক্তিশালী রকেটের সাহায্যে মহাকাশ অভিযানেও উপগ্রহ উৎক্ষেপণে যে পরিমাণ বিষাক্ত গ্যাস বায়ুমন্ডলে নিক্ষেপ করা হয়, তাতেও আবহাওয়া দূষিত হচ্ছে। পারমাণবিক প্রক্রিয়া বলতে পরমাণুর নিউক্লিয়াসে সংঘটিত নিউক্লিয়ার ফিশন (বিভাজন) ও নিউক্লিয়ার ফিউশন (সংযোজন) প্রক্রিয়াকে বোঝায়। পারমাণবিক শক্তি বিদ্যুৎ উৎপাদন, চিকিৎসা, কৃষি ও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে এর সঠিক নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপদ ব্যবস্থাপনা না হলে পরিবেশের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়তে পারে। পারমাণবিক দুর্ঘটনা থেকে ক্ষতিকর বিকিরণ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তেজস্ক্রিয় পদার্থ মাটিতে মিশে দীর্ঘদিন পরিবেশকে দূষিত রাখতে পারে। পারমাণবিক বর্জ্য নদী, হ্রদ বা ভূ গর্ভস্থ পানিতে প্রবেশ করলে জলজ পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। দুর্ঘটনার সময় তেজস্ক্রিয় পদার্থ বাতাসে ছড়িয়ে পড়তে পারে। অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তা উদ্ভিদ, প্রাণী ও অন্যান্য জীবের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ক্যান্সারসহ বিভিন্ন গুরুত্বর স্বাস্থ্যঝুকি সৃষ্টি করতে পারে। অনেক তেজস্ক্রিয় পদার্থ দীর্ঘসময় সক্রিয় থাকে, ফলে দূষণের প্রভাব বহু বছর স্থায়ী হতে পারে।
পরিবেশ দূষণ সমস্যা ও বাংলাদেশ
বাংলাদেশ বর্তমানে পরিবেশ দূষণের একটি গুরুত্বর সমস্যার মুখোমুখি। দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধি, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, শিল্পায়ন, যানবাহনের ধোয়া,ইটভাটা, প্লাস্টিক ও কঠিন বর্জ্য এবং শিল্পকারখানার অপরিশোধিত বর্জ্য পরিবেশ দূষণের প্রধান কারণ। সীমিত ভূ খন্ড এবং তুলনামূলকভাবে অতি ঘন জনবসতি ও দুর্যোগপ্রবণ ভৌগোলিক অবস্থান বাংলাদেশের মানুষকে পরিণত করেছে পরিবেশ দূষণের শিকারে। বাংলাদেশে পরিবেশ দূষণের বিভিন্ন কারণের মধ্যে রয়েছে জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে বাংলাদেশে মুক্তাঞ্চল ও বনভূমির পরিমাণ কমছে। জলাভূমি ভরাট করে ব্যবহার করা হচ্ছে। জমিতে ব্যাপক হারে সার ও কীটনাশক ব্যবহৃত হওয়ায় মাটির দূষণ ঘটছে এবং জমির গুণাগুণ নষ্ট হচ্ছে। এইসব রাসায়নিক উপাদান নদী ও জলাশয়ের পানিতে মিশে গিয়ে জলজ উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত্যুর কারণ হচ্ছে। কলকারখানা থেকে নিঃসৃত তরল রাসায়নিক বর্জ্য পানিকে দূষিত করছে তা মাছের বিলুপ্তির কারণ হয়ে দাড়াচ্ছে। কলকারখানার নির্গত ধোয়া বায়ুমন্ডলকে দূষিত করে জনস্বাস্থ্যের জন্যও হুমকি হয়ে দাড়াচ্ছে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির চাপে প্রতিবছর উজার হচ্ছে ১.৪ শতাংশ বন। ফলে ভূমিক্ষয়ের মাত্রা বাড়ছে, বন্যা প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে এবং দেশের গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ডিপ টিউবওয়েল স্থাপন ও ব্যবহারের ফলে ভূ গর্ভস্থ পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাচ্ছে। এর ফলে উত্তরাঞ্চলে শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট বাড়ছে। প্রকট হচ্ছে পানিতে আর্সেনিক দূষণের সমস্যা। শহরাঞ্চলের ময়লা আবর্জনা পচা গ্যাস বায়ুদূষণ সৃষ্টি করছে। পাহাড় কেটে বসতবাড়ি তৈরি করায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। শহরে অধিক জনসংখ্যার ফলেও পরিবেশ দূষিত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক পরিবেশ বিশ্লেষণেও বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন এবং সীসা দূষণকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশগত সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
পরিবেশ দূষণের প্রতিকারের উপায়
পরিবেশ দূষণ বর্তমান বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। বায়ু, পানি ,মাটি ও শব্দদূষণ মানুষের স্বাস্থ্য, জীববৈচিত্র্য ও প্রাকৃতিক ভারসাম্যের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে। পরিবেশ দূষণ রোধে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রকে সম্মিলিকভাবে কাজ করতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধের জন্য জনবসতি ও সভ্যতার সম্প্রসারণের প্রয়োজনে নির্বিচারে বনায়ন ধ্বংস রোধ করতে হবে। বনের পুনঃপ্রতিষ্ঠা সম্ভব না হলেও, যেখানে সুযোগ আছে, সেখানেই গাছ লাগানো প্রয়োজন। যানবাহন থেকে বিষাক্ত পদার্থযুক্ত কালো ধোয়া যাতে বন্ধ করা যায়, তার জন্য পুরনো ইঞ্জিনচালিত গাড়ির চলাচল নিষিদ্ধ হওয়া দরকার। এ বিষয়ে সরকারি সচেতনতা অত্যন্ত জরুরি। শহর বা জনবসতির কাছাকাছি কলকারখানা না হওয়াই ভালো। তার চুল্লিগুলোর মুখও থাকা উচিত ভূমি থেকে অনেক ওপরে। কলকারখানা থেকে দূষিত পদার্থ নির্বিচারে না ফেলাই ভালো, এগুলো ফেলার আগে প্রয়োজন মতো শোধন করে নেওয়া উচিত। সেই সঙ্গে বায়ুমন্ডলে রকেট নিক্ষেপ ও পারমাণবিক অস্ত্র নিরসন করা উচিত। শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ কঠোরভাবে হওয়া উচিত। ইলেকট্রিক বা হাইড্রোলিক হর্ন, মাইকের যথেষ্ট ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করলেই সে উদ্দেশ্য অনেকাংশে সিদ্ধ হয়। অবিলম্বে আইন করে এগুলো তৈরি, বিক্রি ও ব্যবহার বন্ধ করা জরুরি। কৃষি জমিতে জৈব সার ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত কয়লা ব্যবহার হ্রাস করে বায়ুমন্ডলের দূষণ প্রতিরোধ অবিলম্বে সূচিত হওয়া দরকার। পরিবেশবিধি লঙ্গনকারীদের বিরুদ্ধে কার্যকর আইন প্রয়োগ ও শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম ও সামাজিক সংঘটনের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে। সৌর, বায়ু ও অন্যান্য পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার বাড়াতে হবে। পরিবেশ দূষণ রোধ করা সম্ভব যদি আমরা সচেতনভাবে প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবহার করি এবং দূষণের উৎসগুলো নিয়ন্ত্রণ করি। তাহলেই পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে হ্রাস হতে পারে।
পরিবেশ দূষণের ফলাফল
বায়ু দূষণের ফলে বায়ুতে বিভিন্ন বিষাক্ত গ্যাসের মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঋতুচক্রের আবর্তনে বিপর্যয় দেখা দিচ্ছে, বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হ্রাস পাচ্ছে। বায়ু দূষণে বিভিন্ন রোগজীবাণুর বৃদ্ধিকে দ্রুত করে তুলছে তার ফলে যক্ষা, হাপানি, শ্বাসরোগ, ক্যান্সার, বিভিন্ন চর্মরোগে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। জলদূষণের ফলে মাছের উৎপাদন হ্রাস, জন্ডিস, কলেরা প্রভৃতি রোগ ব্যাপকহারে দেখা দিচ্ছে। স্থলদূষণের ফলে মৃত্রিকা ক্ষয় বাড়ছে, ফসলের উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে, উৎপাদিত ফসল দূষিত হয়ে পড়ছে, শব্দ দূষণের ফলে মানুষের মনের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, বধিরতা, মাথাব্যথা, রক্তচাপ বৃদ্ধি, হৃদরোগ এবং নানারকম মানসিক রোগ দেখা দিচ্ছে। পরিবেশ দূষণের ফলে মানুষ, প্রাণী, উদ্ভিদ এবং সামগ্রিক প্রকৃতির ওপর নানারকম ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে। প্রধান ফলাফলগুলো হলো বায়ু ও পানি দূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট, হৃদরোগ ও ফুসফুসের সমস্যা, ডায়রিয়া ও নানা রোগ বৃদ্ধি পায়। দূষণের কারণে অনেক প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল নষ্ট হয় এবং কিছু প্রজাতি বিলুপ্তির মুখে পড়ে। ধোয়া, বিষাক্ত গ্যাস ও ধুলাবালির কারণে বায়ু দূষিত হয় এবং স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অতিরিক্ত রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও শিল্পবর্জ্যের কারণে মাটির গুণাগুণ নষ্ট হয় এবং কৃষি উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়। গ্রিনহাউজ গ্যাস বৃদ্ধির ফলে বৈশ্বিক উঞ্ষতা বাড়ে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের গতি ত্বরান্বিত হয়। পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হলে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা ও তাপপ্রভাহের ক্ষতিকর প্রভাব আরও বাড়তে পারে। দূষিত মাটি ও পানি এবং পরিবর্তিত জলবায়ুর কারণে ফসলের উৎপাদন ও গুণগত মান কমে যেতে পারে। স্বাস্থ্য ব্যয় বৃদ্ধি, কৃষি ও মৎস উৎপাদন কমে যাওয়া এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় অতিরিক্ত ব্যয়ের ফলে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হয়। বায়ু, পানি, মাটি ও জীবজগতের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পরিবেশের স্বাভাবিক ভারসাম্য নষ্ট হয়। শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ পানিতে মিশে নদী, খাল ও জলাশয়ের জীববৈচিত্র্য নষ্ট করে।
একদিকে আধুনিক
জীবনযাত্রার প্রয়োজন, অন্যদিকে পরিবেশ দূষণ রোধ উভয় দিকে লক্ষ রেখে চলা সহজ কথা নয়।
তবুও মানবজাতি সচেতন হলে এবং সমাজব্যবস্থা সহায়তা করলে, পরিবেশ দূষণের অবসান ঘটানো
না গেলেও তাকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে, এমন আশা করা অসংগত নয়। আজ আর পরিবেশ
দূষণ নয়, চাই তার বিশুদ্ধকরণ। আমাদের সচেতনতাই পারে পরিবেশ দূষণ কমাতে। বসতবাড়ির চারপাশে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখা, নদী ও পুকুরের পানিকে দূষণমুক্ত রাখা, অধিক পরিমাণে বৃক্ষরোপণ ও সংরক্ষণ এসবই করতে হবে। পৃথিবীর সকল মানুষ যখন সমবেতভাবে এ পরিবেশ দূষণমুক্ত রাখতে এগিয়ে আসবে তখনই সম্ভব হবে দূষণমুক্ত পৃথিবীতে শ্বাস নেওয়ার। পরিবেশ দূষণ
বর্তমান বিশ্বের একটি গুরুতর সমস্যা। বায়ু, পানি ও মাটি দূষণের কারণে মানুষ, প্রাণী
ও উদ্ভিদ নানা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। পরিবেশকে সুস্থ ও সুন্দর রাখতে হলে দূষণের কারণগুলো
নিয়ন্ত্রণ করতে হবে এবং বেশি বেশি গাছ লাগাতে হবে। পাশাপাশি প্লাস্টিকের ব্যবহার কমানো,
বর্জ্য সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা এবং সবাইকে পরিবেশ সম্পর্কে সচেতন করা প্রয়োজন। সরকার
জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পরিবেশ দূষণ কমিয়ে একটি সুন্দর. নিরাপদ ও বাসযোগ্য পরিবেশ
গড়ে তোলা সম্ভব।