সবুজে সাজুক বাংলাদেশ বনায়নের গুরুত্ব ও সম্ভাবনা।
পরিবেশ সংরক্ষণে বনায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে বনায়নের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছপালা বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং বায়ুদূষণ কমাতে সাহায্য করে। বনভূমি মাটির ক্ষয় রোধ করে, বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিকতা বজায় রাখে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। গাছপালা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে এবং মানুষের জীবনকে নিরাপদ রাখে। বসবাস উপযোগী পরিবেশের জন্য বনায়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। পরিবেশ আমাদের অস্তিত্বের মূলভিত্তি। সুস্থ, সবল ও টেকসই জীবনের জন্য একটি ভারসাম্যপূর্ণ পরিবেশ অপরিহার্য। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি ও জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আমাদের পরিবেশ আজ হুমকির মুখে। জলবায়ু পরিবর্তন, খরা, অতিবৃষ্টি, প্রাকৃতিক দৃর্যোগসহ নানা দুর্যোগে জর্জরিত বিশ্ব। এই সংকট মোকাবিলায় বনায়ন একটি কার্যকর ও দীর্ঘস্থায়ী সমাধান। কারণ পরিবেশ রক্ষার সবচেয়ে সহজ উপায় হলো গাছ লাগানো। বনায়নের মাধ্যমে বনভূমি বৃদ্ধি ফেলে বিভিন্ন পশু-পাখি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল সংরক্ষিত হয়। বৃক্ষ কেবল নিসর্গ প্রকৃতির শোভা নয়, তা মানুষের জীবনের অপরিহার্য অংশ। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের জীবনের বৃক্ষের ভূমিকা এত অপরিহার্য যে বৃক্ষহীন পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না। দেশের অর্থনীতিতে যেমন বনাঞ্চলের ভুমিকা আছে, তেমনি আবহাওয়া ও জলবায়ুসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনজ সম্পদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বনায়ন বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করে। নদী ভাঙ্গন, ভূমিক্ষয় ও অতিরিক্ত তাপমাত্রার প্রভাবও অনেকাংশে কমানো যায়। উপকূলীয় অঞ্চলে গাছের বেষ্টনী ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতি কমাতেও সাহায্য করে। মানুষ সৃষ্টির বহু আগে থেকেই এই পৃথিবীর স্থলভাগ ছিল বন আর বন্যপ্রাণীতে পরিপূর্ণ। মানুষ নিজ বুদ্ধি, কৌশল আর শক্তি দিয়ে হিংস্র বন্য প্রাণীকুলের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থেকেছে। ধীরে ধীরে গাছ কেটে বনজঙ্গল পরিষ্কার করে গড়ে তুলেছে সমাজ সভ্যতা। বশীভূত করেছে বনের জীবজন্তুসহ গোটা প্রকৃতিকে। মানব সমাজ বংশ বিস্তারের মাধ্যমে ক্রমশ ছড়িয়ে পরেছে গোটা পৃথিবীব্যাপী। সবুজে শ্যামলে, ফুলে ফলে আর ফসলে মানুষে পৃথিবী হয়ে উঠল সৌন্দর্যের এক স্বর্গীয় লীলাভূমি। অথচ আজ মানুষের নিষ্ঠুর আচরণে উজার হচ্ছে বন বনানী। পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য বেশি বেশি গাছ লাগানো, বন উজাড় বন্ধ করা, সামাজিক বনায়ন সম্প্রসারণ ও গাছের যথাযথ পরিচর্যা করা প্রয়োজন। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে বনায়নে অংশগ্রহণ করতে হবে।
বাংলাদেশে বনভূমির পরিমাণ
বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও এর বনভূমি পরিবেশ ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ উপলব্ধ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশের মোট ভূমির প্রায় ১৪.৫ শতাংশ বনভূমি হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ ছিল। এই তথ্যের উৎস জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এর FAOSTAT । পরিবেশ বিজ্ঞানীদের মতে সুস্থ পরিবেশ বজায় রেখে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করতে হলে একটি দেশ মোট আয়তনের শতকরা ২৫ ভাগ বনভূমি থাকতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে সরকারি হিসাবে ১৭ শতাংশ বলা হলেও বাস্তবে আছে ৯/১০ শতাংশ বনাঞ্চল। অর্থাৎ অর্ধেকের চেয়েও কম। আর ওয়ার্ল্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের মতে মাত্র ৫ ভাগ। সুতরাং প্রায় প্রতি বছর সিডর, নার্গিস, আইলা ইত্যাদি নামের ঘূর্ণিঝড়সহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগে এদেশের উপকূলীয় এলাকায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। বাংলাদেশে প্রধানত পাহাড়ি বন, শালবন, সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বন, উপকূলীয় বন এবং জলাভূমির বন রয়েছে। দেশের বনভূমির মধ্যে সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন এবং এটি উপকূলীয় পরিবেশ রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। বনভূমি শুধু কাঠ ও বনজ সম্পদের উৎস নয়, এটি অক্সিজেন সরবরাহ, কার্বন শোষণ, মাটির ক্ষয়রোধ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই বিদ্যমান বনভূমি সংরক্ষণের পাশাপাশি পরিকল্পিতভাবে নতুন বন সৃষ্টি করা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের বনভূমি প্রধানত পাহাড়ি বন, শালবন ও ম্যানগ্রোভ বন এই ধরনের বনাঞ্চলে বিভক্ত। এর মধ্যে সুন্দরবন বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ম্যানগ্রোভ বন এবং বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা রাখে। দেশের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে বন উজার বন্ধ করতে হবে, নতুন বন সৃষ্টি করতে হবে, সামাজিক বনায়ন ও বিদ্যমান বনভূমির যথাযথ সংরক্ষণ করতে হবে।
বাংলাদেশের বনভূমি
বাংলাদেশের প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলো বনভূমি। বনভূমি শুধু সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবন জীবিকার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের ভূ গর্বস্থ প্রকৃতি বনায়নের জন্য অত্যন্ত সহায়ক। আমাদের দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন আছে। যেমন গাজীপুর জেলার অন্তর্গত ভাওয়ালের গজারি বন, টাঙ্গাইলের মধুপুরের বন, খুলনা বিভাগের অন্তর্গত সুন্দরবন, পার্বত্য চট্টগ্রামের বনভূমি, কুমিল্লার শালবন বিহার ইত্যাদি। এককালে এসব বনাঞ্চল বড় বড় গাছপালায় পরিপূর্ণ ছিল। বর্তমানে বনভূমি প্রায় উজার হওয়ার পথে। এতে পরিবেশগত দিক থেকে বাংলাদেশ ভীষণ সংকটের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বনভূমি ও মানবজীবন
বনভূমি মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। বনভূমি শুধু কাঠ, জ্বা্লানি ও বিভিন্ন বনজ সম্পদের উৎস নয়, এটি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে, জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। গাছপালা বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে, এতে মানুষের সুস্থভাবে বেচে থাকার উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি হয়। বনভূমি মানবজীবনকে সুশোভিত করে। ঋতুচক্রের আবর্তনের পথে উভয়ের একই স্পর্শকাতরতা। বসন্তের দক্ষিণ বাতাসে মানুষ তার হৃদয়ের আনন্দানুভূতিকে চিত্রে, সংগীতে কিংবা কবিতায় প্রকাশ করে। আর অরণ্য তার বসন্ত বেদনাকে প্রকাশ করে অশোক, পলাশ, কৃষ্ঞচূড়ার রক্তিম গাঢ়তায়। উভয়ের আদান প্রদানের সম্পর্কও অতি নিভিড়। এক বিপুল ভ্রান্তিবিলাশের জন্য মানুষ এতদিন তার পরম বন্ধুকে চরম শত্রু মনে করে নির্বোধ ঘাতকের মতো ধ্বংসের পৈশাচিক লীলায় মেতে ওঠেছিল। কাজেই আজ আর বনভূমি ধ্বংস নয়, বনভূমি সৃজনই প্রয়োজন। বনভূমি মানবজীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রাকৃতিক সম্পদ। মানুষ ও প্রকৃতির মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় বনভূমির ভূমিকা অপরিসীম। গাছপালা অক্সিজেন উৎপন্ন করে, যা মানুষের বেচে থাকার জন্য অপরিহার্য। বনভূমি কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। বনভূমি ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ভূমিক্ষয় ও বন্যার ক্ষতি কিছুটা কমাতে পারে। বন বৃষ্টির পানি ধরে রাখে এবং ভূগর্ভস্থ পানির পূনর্ভরণে সাহায্য করে। কাঠ, ফল, মধু, ঔষধি উদ্ভিদসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতিতে অবদান রাখে। বনে অসংখ্য প্রাণী, পাখি ও কীটপতঙ্গের আবাসস্থল। সবুজ বনভূমি মানুষের মানসিক চাপ কমাতে এবং সুস্থ্য পরিবেশ গড়ে তুলতে সহায়তা করে। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও বন উজারের ফলে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, ফলে জলবায়ু পরিবর্তন, মাটিক্ষয়, বন্যা, খরা ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের মতো সমস্যা বাড়ছে।
বন উজাড়
বৃক্ষ প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা করে
বৃক্ষ প্রকৃতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পৃথিবীর পরিবেশ এবং জীবজগতের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় বৃক্ষের ভূমিকা অপরিসীম। বৃক্ষ বাতাস থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড গ্রহণ করে এবং অক্সিজেন ছাড়ে, ফলে বায়ুর গুণমান ভালো থাকে। এটি তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং বৈশ্বিক উষ্ঞতা কমাতে ভূমিকা রাখে। গাছপালা পরিবেশের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ও বায়ুদূষণ কমাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বৃক্ষ পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা করে। বৃক্ষকে আবহাওয়া ও জলবায়ুর নিয়ন্ত্রক বলা হয়। গাছপালা অধিক বৃষ্টিপাতে সহায়তা করে, নদীভাঙ্গন থেকে ভূ ভাগকে রক্ষা করে। বৃক্ষ মাটির ক্ষয়রোধ করে এবং মাটির উর্বরতা বজায় রাখতে সাহায্য করে। গাছের শিকর মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখায় বৃষ্টির পানিতে মাটি সহজে ধুয়ে যায় না। অতএব আমাদের পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ুর ভারসাম্য রক্ষা এবং খাদ্য ঘাটতির হাত থেকে দেশকে রক্ষার জন্যে বনাঞ্চল সৃষ্টি ও বনসম্প্রসারণের বিকল্প নেই। বৃক্ষ মাটির ক্ষয় রোধ করে, বৃষ্টির পানি ধরে রাখে এবং জলচক্র স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি বনভূমি অসংখ্য পশু পাখি ও অন্যান্য জীবের আবাসস্থল হওয়ায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও বৃক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ঝড়, বন্যা ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষয়ক্ষতিও গাছপালা কিছুটা কমাতে পারে। পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতে বৃক্ষরোপণ, বনসংরক্ষণ ও নির্বিচারে গাছ কাটা বন্ধ করা অত্যন্ত জরুরি। বনভূমি বিভিন্ন পশুপাখি ও জীবজন্তুর আবাসস্থল। বৃক্ষনিধন হলে জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে এবং খাদ্যশৃঙ্খলে বিরূপ প্রভাব সৃষ্টি হয়। বেশি বেশি করে বৃক্ষরোপণ করলে পরিবেশ আরও সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য হয়। প্রাকৃতিক পরিবেশকে সুস্থ, সুন্দর ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে বেশি বেশি বৃক্ষরোপণ এবং বন সংরক্ষণ করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
বাংলাদেশ হুমকির মুখে
বাংলাদেশ ভৌগোলিক অবস্থান ও ঘনবসতির কারণে বিভিন্ন পরিবেশগত হুমকির মুখে রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বন্যা ও নদীভাঙনের ঝুকি বাড়ছে। উপকূলীয় মানুষের জীবনজীবিকা এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ক্রমাগত বৃক্ষ নিধনের ফলে বায়ুমন্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইড বা গ্রিন হাউজ গ্যাস বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাংলাদেশ আজ হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্বে তাপমাত্রা দশমিক ৫ থেকে ২ ডিগ্রি বাড়লে বাংলাদেশ সংলগ্ন সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে ১০ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার। এতে উপকূলের ১৫ ভাগ ভূমি সমুদ্রে বিলীন হয়ে যাবে। ৭৫০ কিলোমিটারের এই উপকূলীয় এলাকা তলিয়ে গেলে ২ কোটি অধিবাসী নিজের বসতবিটা হারিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে বাধ্য হবে। এছাড়া সারা দেশেই ঝড়, বন্যা, নদী ভাঙনসহ নানান প্রাকৃতিক দুর্যোগ বৃদ্ধি পেতে থাকবে। এ থেকে মুক্তির পথ এখনই উদ্ভাবন করতে হবে। আর এক্ষেত্রে বনায়নই হতে পারে অন্যতম হাতিয়ার। যেসব কারণে বাংলাদেশ হুমকির মুখে তার প্রধান কারণগুলো হলো কাঠ ও জ্বালানির চাহিদায় অনেক ক্ষেত্রে নির্বিচারে গাছ কাটা হচ্ছে। বসতি, কৃষি, শিল্প ও বিভিন্ন অবকাঠামোর জন্য বনভূমি রূপান্তর করা হচ্ছে।সীমিত ভূমির ওপর বাড়তি জনসংখ্যার চাপ বনভূমির ওপরও প্রভাব ফেলছে। নতুন রাস্তা, আবাসন ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান নির্মাণে বনাঞ্চল ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বন ধ্বংস হলে বন্যপ্রাণী উপকূলীয় বনায়ন র আবাসস্থল নষ্ট হয় এবং অনেক প্রজাতি বিলুপ্তির ঝুকিতে পড়ে। বন কমে গেলে কার্বন শোষণের ক্ষমতা কমে যায়, ফলে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি আরও বাড়তে পারে। বন উজার, বৃক্ষনিধন, বায়ু ও পানি দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট করছে। শিল্পকারখানার বর্জ্য ও যানবাহনের ধোয়া পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি মানুষের স্বাস্থ্যের ওপরও ক্ষতিকর প্রভাব ফেলছে। জীববৈচিত্র্যও এসব কারণে হুমকির মুখে পড়ছে।
বনায়নের প্রয়োজনীয়তা
বনায়ন একটি দেশের পরিবেশ, অর্থনীতি ও মানুষের জীবনযাত্রার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃক্ষ আমাদের অক্সিজেন সরবরাহ করে, কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং বায়ুদূষণ কমাতে সাহায্য করে। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনায়নের প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। বৃক্ষ মানুষের আদি ও অকৃত্রিম বন্ধু। বৃক্ষ শুধু কলকারখানা আর যানবাহনের নিঃসরণকৃত কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে না, মানুষ তথা সমগ্র প্রাণীকূলের ত্যাগ করা বিষাক্ত কার্বন ডাই অক্সাইডও শোষণ করে নেয় এবং মানুষ ও প্রাণীকূল শ্বাস প্রশ্বাসের মাধ্যমে যে অক্সিজেন গ্রহণ করে বেচে থাকে তার যোগান দেয় বৃক্ষ। বনায়নের প্রয়োজনীয়তাগুলো হলো গাছ অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে।গাছপালা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে এবং জলবায়ুর প্রভাব কমাতে ভূমিকা রাখে। উপকূলীয় বনায়ন ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস কমাতে সাহায্য করে। গাছের শিকড় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রাখে এবং নদীভাঙন ও ভূমিক্ষয় কমায়। বনভূমি বিভিন্ন প্রাণী ও উদ্ভিদের নিরাপদ আবাসস্থল। বনভূমি মাটিতে পানি ধরে রাখতে এবং ভূগর্ভস্থ পানির পূনর্ভরণে সহায়তা করে। কাঠ, ফল, মধু, ঔষধি উদ্ভিদসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ মানুষের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে। গাছ বাতাসের বিভিন্ন দূষিত কণা শোষণ করে পরিবেশকে তুলনামূলক পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে। বৃক্ষ প্রকৃতিকে শীতল রাখে, বৃক্ষের ছায়ায় আমরা শান্তির পরশ পাই। বনভূমি বিভিন্ন পশুপাখি ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হওয়ায় জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণেও বনায়নের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব মোকাবিলাতেও বৃক্ষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সুস্থ ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে আজকের বনায়ন অত্যন্ত জরুরি। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করার জন্য, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে ব্যাপক বনায়ন অপরিহার্য।
বনায়নের উপায়
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও বনভূমি বৃদ্ধি করতে পরিকল্পিকভাবে বনায়ন করা প্রয়োজন। বাংলাদেশে বনায়নের সম্ভাবনা বিপুল। নানাভাবে এ বনায়ন সম্ভব। একটি পন্থা হলো সামাজিক বন উন্নয়ন কর্মসূচি। এর লক্ষ্য হলো রাস্তার পাশে বৃক্ষরোপণে জনসাধারণকে সক্রিয়ভাবে যুক্ত করা। এ কাজে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা দরকার। নানা জাতের বৃক্ষ মিশ্রণ করে রোপন করা যাতে গ্রামবাসি খাদ্য, ফল, জ্বালানি ইত্যাদি আহরণ করতে পারে। বাড়ির আঙিনা, রাস্তার পাশে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও খালি জায়গায় গাছ লাগাতে হবে। স্থানীয় জনগনকে সম্পৃক্ত করে রাস্তা, বাধ ও পতিত জমিতে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগাতে হবে। অবৈধভাবে গাছকাটা বন্ধ করতে হবে এবং বনভূমি সংরক্ষণ করতে হবে। উপকূলীয় এলাকায় লবণসহিষ্ঞু ও উপযোগী গাছ লাগিয়ে সবুজ বেষ্টনী গড়ে তুলতে হবে। শুধু গাছ লাগালেই হবে না, নিয়মিত পানি দেওয়া, আগাছা পরিষ্কার ও প্রয়োজনীয় সুরক্ষা দিতে হবে। বৃক্ষের উপকারিতা সম্পর্কে গণমাধ্যম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান সামাজিক সংঘটনের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করতে হবে। অবৈধভাবে বনভূমি দখল ও গাছ কাটার বিরুদ্ধে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে। ওয়ার্ড মেম্বারের নেতৃত্বে এবং শিক্ষক, সমাজকর্মী, মসজিদের ইমাম প্রমুখের সমন্বয়ে গঠিত গ্রাম সংস্থা এই বনায়নের প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারে। এ সংস্থার কাজ হবে সরকারি বেসরকারি দপ্তরের সাথে সামাজিক বনায়ন বৃক্ষায়ণ সম্পর্কিত সকল বিষয় তদারক করা এবং গ্রামের জনসাধারণকে পারিবারিকভিত্তিতে বনায়নের কাজে সম্পৃক্ত করা। তারা বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যার ভার গ্রহণ করবে এবং এ থেকে যে আয় হবে, নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সে আয়ের অংশ তারা পাবে। এভাবে যেসব পরিবার খালি জায়গা বা পাহাড় পর্বতের আশেপাশে থাকে তাদের সেখানে বনায়নে সম্পৃক্ত করা হবে। সাধারণ জনগনকে যদি বিপন্ন পরিবেশের ভয়াবহতা সম্পর্কে অবহিত করা এবং বৃক্ষ রোপণে উদ্বুদ্ধ করা যায় তাহলে অনেকেই বনায়নের কাজে এগিয়ে আসবেন। এজন্য শুরু হয়েছে নতুন এক আন্দোলন “গাছ লাগাও পরিবেশ বাচাও”।
বনায়নে গৃহীত পদক্ষেপ
বনাঞ্চলের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্রয়োজন নানা ধরনের বনায়ন কর্মসূচি। সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। এর মধ্যে কমিউনিটি বনায়ন কর্মসূচির আওতায় বারো হাজার একর জ্বালানি কাঠের বাগান, তিনশো একর বন বাগান, তিন হাজার একর স্ট্রিপ বাগান স্থাপন উল্লেখযোগ্য। ৭ হাজার গ্রাম্যকে এই কর্মসূচির আওতায় আনা হয়। বনায়ন সম্পর্কে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য ৮০ হাজার ব্যক্তিকে প্রশিক্ষণ প্রদান করা হয় এবং জনসাধারণের মধ্যে ৬ কোটি চারা বিতরণ করা হয়। এভাবে ব্যাপক জনগনের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচি ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বর্তমানে বনায়নে নানান কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। রেল, সড়ক ও বাধ এলাকায় গাছ লাগিয়ে বনায়নের পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় জনগণকে সম্পৃক্ত করে বন সৃষ্টি ও পরিচর্যার ব্যবস্থা করা হয়েছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষতি কমাতে উপকূলীয় এলাকায় গাছের বেষ্টনী তৈরি করা হয়েছে। অবৈধভাবে গাছ কাটা ও বন দখল বন্ধে আইন প্রয়োগ এবং নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। জনগণের মধ্যে গাছ লাগানোর আগ্রহ বাড়াতে নিয়মিত বৃক্ষরোপণ অভিযান ও মেলা আয়োজন করা হয়। অভয়ারণ্য, জাতীয় উদ্যান ও সংরক্ষিত বনাঞ্চল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সরকারি নার্সারির মাধ্যমে বিভিন্ন প্রজাতির চারা উৎপাদন করে জনগনের মধ্যে বিতরণ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, বনভূমি বৃদ্ধি এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন ধরনের বনায়ণমূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বনাঞ্চল ও বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল রক্ষায় সংরক্ষিত বন ও অভয়ারণ্য ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বনসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার ও সংরক্ষণের জন্য পরিকল্পিত বন ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দেওয় হচ্ছে।
প্রাকৃতিক বনের স্বভাবিক চিত্র
প্রাকৃতিক বন হলো এমন বন, যেখানে মানুষের পরিকল্পিত হস্তক্ষেপ ছাড়াই প্রকৃতির নিয়মে বিভিন্ন ধরনের গাছপালা, লতাগুল্ম, ঝোপঝাড় ও বিভিন্ন প্রাণী প্রকৃতির নিজস্ব নিয়মে বেড়ে ওঠে। এখানে মানুষের পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানোর প্রয়োজন হয় না, বীজের বিস্তার, বৃষ্টিপাত, মাটি ও জলবায়ুর ওপর নির্ভর করে বন স্বভাবিকভাবে গড়ে ওঠে। প্রাকৃতিকভাবে একটি বন গড়ে ওঠে হাজার বছর ধরে। বনের মাটিতে আপনা থেকেই জন্মায় শত প্রজাতির বৃক্ষ, লতাগুল্ম, পুষ্টিকর নানা শাকসবজি ও ফলমূল। একেকটি বৃক্ষ একেক বয়সের। আর এমন বৃক্ষ আশ্রয় করে বেড়ে ওঠে নানা প্রজাতির, নানা বয়সি লতাগুল্ম। এ নিবিড় বনের পরতে পরতে থাকে অজস্র প্রাণ বৈচিত্র্য। শত প্রজাতির পাখ পাখালি, জীবজন্তুর অবাধ বিচরণক্ষেত্র বন। এ অরণ্যে তাদের খাবারের অভাব নেই, নেই অজানা বিপদের আশঙ্কা। বনের আরেক অবিচ্ছেদ্য অংশ ক্ষুদ্র জাতিসত্তার আদিবাসী মানুষ। শত শত বছর ধরে বনকে আশ্রয় করেই এরা বেচে থাকে। প্রাকৃতিক বনের স্বাভাবিক চিত্রে দেখা যায় বড় বড় গাছের পাশাপাশি ছোট গাছ, লতাগুল্ম, বাশ ও নানা ধরনের উদ্ভিদ রয়েছে। বনের ভেতরে পাখি, হরিণ, বানর, কীটপতঙ্গসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর বিচরণ থাকে। গাছের ঘন পাতার কারণে বনের ভেতর সাধারণত শীতল ও স্নিগ্ধ পরিবেশ বিরাজ করে। ঝর্ণা, খাল বা জলাশয় থাকলে বনের সৌন্দর্য আরও বৃদ্ধি পায়। প্রাকৃতিক বনে বিভিন্ন ধরনের পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, কীটপতঙ্গ ও অন্যান্য জীব বসবাস করে। পাছপালা ও প্রাণীদের মধ্যে খাদ্য ও আশ্রয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক থাকায় এখানে একটি স্বাভাবিক খাদ্যশৃঙ্খল গড়ে ওঠে। বনভূমির মাটি সাধারণত পাতা ও জৈব পদার্থে মুগ্ধ থাকে। প্রাকৃতিক বন বায়ু থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন সরবরাহ করে স্থানীয় জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। গাছের শিকর মাটিকে ধরে রাখায় মাটিক্ষয় কমে ও বন বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে সাহায্য করে। ফলে পরিবেশের ভারসাম্য বজায় থাকে।
বাংলাদেশের বনাঞ্চল
বাংলাদেশের বনাঞ্চল দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বনভূমি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, মাটিক্ষয় রোধ এবং জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের বনাঞ্চল ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বিভিন্ন ধরনের। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের বনভূমির পরিমাণ দেশের মোট ভূমির প্রায় আঠারো শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের সমুদ্র উপকূলবর্তী সুন্দরবন, চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলের কিছু অঞ্চল। বাংলাদেশের বনাঞ্চল দেশের প্রাকৃতিক সম্পদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বনভূমি দেশের পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা, জীববৈচিত্র্যের সংরক্ষণ এবং মানুষের জীবন জীবিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের বনাঞ্চল প্রধানত পাহাড়ি বন, শালবন ও ম্যানগ্রোভ বন এই কয়েক ধরনের পরিবেশে বিস্তৃত। খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা অঞ্চলে অবস্থিত বিশ্বের বৃহৎ ম্যানগ্রোভ বন। রয়েল বেঙ্গল টাইগারসহ নানা প্রাণীর আবাসস্থল। চট্টগ্রাম, পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে পাহাড়ি বনে রয়েছে। এখানে বিভিন্ন প্রজাতির গাছপালা ও বন্যপ্রাণী দেখা যায়। গাজীপুর, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল ও কুমিল্লার কিছু এলাকায় শালবনের অবশিষ্ট অংশ রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় বনের মাধ্যমে গড়ে ওঠা বন ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় ভাঙ্গনের ক্ষতি কমাকে সাহায্য করে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের কাচামাল হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বনজ সম্পদ। পার্বত্য চট্টগ্রামের বৃক্ষরাজি শোভিত পাহাড়গুলোর বেশিরভাগই ন্যাড়া। উত্তর পশ্চিমাঞ্চলের বনভূমির পরিমাণ নেমে এসেছে ৫ শতাংশে এরই বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়ছে আবহাওয়ায়। বাতাস দূষিত হচ্ছে, ক্ষয়ে যাচ্ছে মাটি। বননির্ভর বৈচিত্র্য বিলীন হওয়ার আশংঙ্কায়। খাদ্য, ঔষধ শিল্পের কাচামাল, শক্তি ও পরিবেশ সেবার যে অংশ আসে বন থেকে, বৃক্ষ নিধনের ফলে তা সংকটের মুখোমুখি।
পরিবেশ ও বনায়ন
পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা ও একটি সুন্দর বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ে তুলতে বনায়নের গুরুত্ব অপরিসীম। গাছপালা পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ। গাছপালা পরিবেশ থেকে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে এবং অক্সিজেন ছাড়ে। গাছপালা বায়ুদূষণ ও অতিরিক্ত তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে। ফলে বায়ু বিশুদ্ধ থাকে এবং মানুষের স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি হয়। বিশেষজ্ঞ গবেষকদের মতে, বর্তমানে বিশ্বের বনভূমি উজার হতে হতে অর্ধেকে এসে দাড়িয়েছে। এর ফলে বিশ্ব পরিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। অথচ মানুষের বসবাসের উপযোগী ভারসাম্যপূর্ণ পৃথিবীর জন্যে দরকার গাছপালা। গাছপালা কেবল অক্সিজেন দিয়ে আমাদের জীবন রক্ষা করে না, প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায়ও পালন করে অপরিহার্য ভূমিকা। প্রস্বেদন প্রক্রিয়া ও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে আবহাওয়ামন্ডলকে বিশুদ্ধ রাখে, জলীয় বাষ্প তৈরি করে বাতাসের আর্দ্রতা বাড়িয়ে বায়ুমন্ডকে রাখে শীতল। বৃক্ষ বৃষ্টি করিয়ে ভূমিতে পানির পরিমাণ বৃদ্ধি করে, বাড়িয়ে দেয় মাটির জলধারণ ক্ষমতা। এ ছাড়াও গাছপালা মাটির উর্বরতা বাড়ায়, মাটির ক্ষয় রোধ করে। ঝড় ঝঞ্ঝা বন্যা রোধেও পালন করে সহায়ক ভূমিকা। মাটির ওপর শীতল ছায়া বিছিয়ে দিয়ে ঠেকায় মরুকরণের প্রক্রিয়াকে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, নগরায়ণ, শিল্পায়ন ও বন উজারের কারণে পরিবেশ নানা সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে। তাই রাস্তার পাশে, পতিত জমিতে, উপকূলীয় এলাকায়, শিক্ষা ও সরকারি প্রতিষ্ঠানের আশেপাশে পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো প্রয়োজন। নির্বিচারে বৃক্ষনিধন ও বন উজাড় পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এতে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল নষ্ট হয়, মাটিক্ষয় বাড়ে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুকি বৃদ্ধি পায়। পরিবেশ রক্ষায় নতুন গাছ লাগানোর পাশাপাশি বিদ্যমান বনাঞ্চল সংরক্ষণ করাও জরুরি। পরিবেশকে সুস্থ ও ভারসাম্যপূর্ণ রাখতে সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি জনগণের অংশগ্রহণে বৃক্ষরোপণ ও বন সংরক্ষণ কার্যক্রম গড়ে তুলতে হবে।
বনায়নের উপকারিতা
বনাঞ্চলে বৃক্ষনিধন ও তার প্রতিক্রিয়া
বনায়ন পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের সুস্থ ও সুন্দর জীবন নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গাছপালা আমাদের অক্সিজেন দেয়, বায়ুদূষণ কমায়, মাটির ক্ষয় রোধ করে এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করে। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলাতেও বনায়নের ভুমিকা অপরিসীম। বেশি বেশি গাছ লাগানোর পাশাপাশি বন উজার বন্ধ করতে হবে। সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রত্যেক নাগরিককে বনায়নে এগিয়ে আসতে হবে। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা একটি সবুজ, সুন্দর ও বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলতে পারি। দেশের অর্থনীতিতে যেমন বনাঞ্চলের ভূমিকা আছে, তেমনি আবহাওয়া ও জলবায়ুসহ প্রাকৃতিক পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় বনজ সম্পদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বৃক্ষরাজি মানুষের সুখ দুঃখের সাথী। কাজেই বৃক্ষ রোপণের মাধ্যমে আমাদের চারপাশের পরিবেশকে সাজাতে হবে সবুজ শ্যামলিমায়। নতুন প্রাণের স্পন্দনে মাতিয়ে তুলতে হবে প্রকৃতিকে। বৃক্ষ আমাদের প্রাকৃতিক বন্ধু এবং রক্ষক। আমাদের উচিত প্রচুর পরিমাণে বৃক্ষরোপণ ও পরিচর্যা করা। যাতে আমরা নানাভাবে লাভবান হতে পারি।

