চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অগ্রগতি মানবসভ্যতার জন্য এক বিরাট আশীর্বাদ। বর্তমান সময়ে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সমন্বয়ে চিকিৎসাব্যবস্থা আগের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও নির্ভুল হয়েছে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে চিকিৎসাবিজ্ঞান আরও উন্নত হয়ে মানুষের রোগ নির্ণয় ও চিকিৎসায় নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করবে। বর্তমানে রোগ নির্ণয়ের জন্য এক্স রে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, ইসিজি, ইকোকার্ডিওগ্রাফিসহ নানা আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহৃত হচ্ছে। এসব প্রযুক্তির মাধ্যমে শরীরের ভেতরের বিভিন্ন সমস্যা শনাক্ত করা যায়। আধুনিক ওষুধ ও টিকার মাধ্যমে অনেক রোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে। ক্যান্সার, হৃদরোগ, কিডনি রোগসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় উন্নতি পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। জটিল অস্ত্রোপচারে লেজার, মাইক্রোসার্জারি ও রোবটিক প্রযুক্তির ব্যবহারও চিকিৎসাকে আরও নিখুত করছে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকার মানুষ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে পারছেন। ইলেকট্রনিক স্বাস্থ্য রেকর্ড রোগীর চিকিৎসার তথ্য সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও রোগের তথ্য বিশ্লেষণ এবং কিছু ক্ষেত্রে রোগ শনাক্তকরণে চিকিৎসকদের সহায়তা করছে। ভবিষ্যতে চিকিৎসা বিজ্ঞান আরও উন্নত ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক হতে পারে। রোগীর জেনেটিক বৈশিষ্ট বিশ্লেষণ করে তার জন্য উপযোগী চিকিৎসা নির্বাচন করার সুযোগ আরও বাড়তে পারে।

একই রোগের জন্য সবার ক্ষেত্রে একই চিকিৎসার পরিবর্তে রোগীর নিজস্ব বৈশিষ্য অনুযায়ী চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হবে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম অঙ্গ, টিস্যু ইঞ্জিনিয়ারিং ও পূনর্জন্মমূলক চিকিৎসা আরও উন্নত হলে ক্ষতিগ্রস্থ অঙ্গ বা টিস্যু পুনর্গঠনের সম্ভাবনা বাড়বে। নতুন ওষুধ ও উন্নত টিকার আবিষ্কারের মাধ্যমে বহু জটিল রোগ নিয়ন্ত্রণের পথ আরও সহজ হতে পারে। রোবটিক সার্জারি ভবিষ্যতে আরও উন্নত হয়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম অস্ত্রোপচারে সহায়তা করতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বড় পরিমাণ চিকিৎসা তথ্য বিশ্লেষণ করে রোগের ঝুকি আগে থেকে শনাক্ত করতে চিকিৎসকদের সাহায্য করতে পারে। নতুন ওষুধ ও উন্নত টিকার আবিষ্কারের মাধ্যমে বহু জটিল রোগ নিয়ন্ত্রণের পথ আরও সহজ হতে পারে। চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানের বর্তমান সাফল্য মানুষের জীবনকে নিরাপদ ও সুস্থ করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ভবিষ্যতের বিজ্ঞান চিকিৎসাকে আরও নির্ভুল করে তুলতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তির পাশাপাশি দক্ষ চিকিৎসক, নৈতিকতা, রোগীর গোপনীয়তা এবং সবার জন্য সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ওষুধ আবিষ্কারে বিজ্ঞানের অবদান
মানবসভ্যতার কল্যাণে বিজ্ঞানের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অবদান হলো বিভিন্ন রোগের ওষুধ আবিষ্কার।প্রাচীনকালে মানুষ রোগের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে খুব কম জানত। বিভিন্ন ভেষজ ওষুধ ও প্রাকৃতিক উপাদান ব্যবহার করে রোগের চিকিৎসা করা হতো। অনেক সময় সামান্য রোগও মানুষের মৃত্যুর কারণ হয়ে দাড়াত। কিন্তু বিজ্ঞান ও চিকিৎসা গবেষণার অগ্রগতির ফলে বর্তমানে অসংখ্য রোগের জন্য কার্যকর ওষুধ আবিষ্কৃত হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বিভিন্ন রোগের কারণ রোগ সৃষ্টিকারী ও মানবদেহে তাদের প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেন। দীর্ঘ গবেষণা ও পরীক্ষার মাধ্যমে নতুন ওষুধের কার্যকারিতা ও নিরাপত্তা যাচাই করা হয়। এরপর প্রয়োজনীয় অনুমোদনের মাধ্যমে তা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। এভাবে আধুনিক ওষুধ আবিষ্কারের প্রক্রিয়া মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ব্যাকটেরিয়াজনিত বিভিন্ন সংক্রমণের চিকিৎসায় অ্যান্টিবায়োটিক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আবার কিছু ভাইরাসজনিত রোগের জন্যও অ্যান্টিভাইরাল ওষুধ ব্যবহার করা হয়। এসব ওষুধ সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে। বিজ্ঞানের গবেষণার ফলে ইনসুলিনসহ বিভিন্ন ওষুধ ও চিকিৎসা পদ্ধতি তৈরি হয়েছে যা ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। ফলে ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষ নিয়মিত চিকিৎসা নিয়ে স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারেন। উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কোলেস্টরল ও হৃদরোগের বিভিন্ন অবস্থার জন্য বিজ্ঞানীরা নানা ধরনের ওষুধ আবিষ্কার করেছেন। ক্যান্সারের চিকিৎসায় বিভিন্ন ধরনের ওষুধ ব্যবহৃত হয়। কেমোথেরাপির ওষুধের পাশাপাশি নির্দিষ্ট কিছু ক্যান্সারের ক্ষেত্রে টার্গেটেড থেরাপি ও ইমিউনোথেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতিও ব্যবহৃত হচ্ছে। রোগের ধরন অনুযায়ী চিকিৎসা নির্বাচন করা হয়। বর্তমানে কম্পিউটার মডেলিং, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, জেনেটিক গবেষণা এবং উন্নত ল্যাবরেটরি প্রযুক্তি ওষুধ গবেষণাকে আরও দ্রুত করতে সহায়তা করছে। ভবিষ্যতে রোগীর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য ও জেনেটিক তথ্য বিবেচনা করে আরও নির্দিষ্ট ওষুধ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
টিকা আবিষ্কারে বিজ্ঞানের অবদান
মানবসভ্যতার ইতিহাসে টিকা আবিষ্কার বিজ্ঞানের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও যুগান্তকারী অবদান। টিকা আবিষ্কারের আগে গুটিবসন্ত, পোলিও, হাম, ডিপথেরিয়াসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগে অসংখ্য মানুষ মারা যেত। শিশুদের মৃত্যুহারও অনেক বেশি ছিল। বিজ্ঞানীরা রোগ সৃষ্টিকারী জীবাণু ও মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করে এমন পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন। যার মাধ্যমে শরীরকে নির্দিষ্ট রোগের বিরুদ্ধে আগে থেকেই প্রস্তুত করা যায়, এই পদ্ধতিই টিকাদান। টিকা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট জীবাণু বা তার কোনো অংশ চিনতে শেখায়। ভবিষ্যতে সেই জীবাণুর সংস্পর্শে এলে শরীর দ্রুত প্রতিরোধ ব্যবস্থা সক্রিয় করতে পারে। টিকা সাধারণত রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে। টিকাদানকে রোগ প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর ব্যবস্থা হিসেবে ধরা হয়। শিশুদের হাম, ডিপথেরাপি, হুপিং কাশি, টিটেনাস, হেপাটাইটিস বি ইত্যাদি রোগ থেকে সুরক্ষার জন্য টিকা দেওয়া হয়। সময়মতো টিকা গ্রহণ করলে এসব রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে উঠতে সাহায্য করে। কোনো রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা তৈরি হলে অনেকভাবে টিকাদানের মাধ্যমে সংক্রমণ ও গুরুতর অসুস্থতার ঝুকি কমানো সম্ভব হতে পারে। কিছু নির্দিষ্ট টিকা গর্ভবতী নারী ও নবজাতকের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে টিটেনাসের মতো রোগ প্রতিরোধে যথাযথ টিকাদান মা ও শিশুর জন্য উপকারী।বর্তমানে জেনেটিত প্রযুক্তি, উন্নত ল্যাবরেটরি পদ্ধতি ও কম্পিউটারভিত্তিক গবেষণা টিকা উন্নয়নে সহায়তা করছে। টিকার সবচেয়ে বড় অবদান হলো রোগ হওয়ার আগেই মানুষকে সুরক্ষিত করার সুযোগ তৈরি করা। টিকাদানের মাধ্যমে অসংখ্য গুরুত্বর সংক্রামক রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব হয়েছে তাছাড়া অনেক মানুষের জীবন রক্ষা পেয়েছে। টিকাদান বিজ্ঞান ও জনস্বাস্থ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। ভবিষ্যতে নতুন ও পুরোনো রোগ মোকাবিলায় আরও উন্নত ও কার্যকর টিকা আবিষ্কারে বৈজ্ঞানিক গবেষণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
জীবাণু ও সংক্রামক রোগে বিজ্ঞানের অবদান
জীবাণু হলো অতি ক্ষুদ্র জীব বা জীবের অংশ, যাদের খালি চোখে দেখা যায় না। বিভিন্ন ধরনের জীবাণুর মাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস, ছত্রাক ও পরজীব উল্লেখযোগ্য। কিছু জীবাণু মানুষের জন্য উপকারি হলেও অনেক জীবাণু মানুষের শরীরে প্রবেশ করে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এসব জীবাণুর মাধ্যমে এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির মধ্যে যে রোগ ছড়িয়ে পড়ে তাকে সংক্রামক রোগ বলা হয়। সংক্রামক রোগ বিভিন্ন উপায়ে মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। আক্রান্ত ব্যক্তির হাচি কাশি, দূষিত পানি ও খাবার, অপরিষ্কার হাত, আক্রান্ত ব্যক্তির রক্ত বা শরীরের তরল, দূ্ষিত বস্তু এবং মশা মাছির মতো বাহকের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে।
অস্ত্রোপচারে বিজ্ঞানের অবদান
মানবিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শাখা হলো অস্ত্রোপচার। একসময় অস্ত্রোপচার ছিল অত্যন্ত ঝুকিপূর্ণ ও যন্ত্রণাদায়ক। পর্যাপ্ত জ্ঞান, আধুনিক যন্ত্রপাতি, অ্যানেস্থেশিয়া ও জীবাণুনাশক ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য অস্ত্রোপচারেও রোগীর মৃত্যু ঘটতে পারে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অস্ত্রোপচার আজ অনেক বেশি নিরাপদ হয়েছে। অস্ত্রোপচারে বিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় অবদানগুলোর একটি হলো অ্যানেস্থেশিয়া। এর মাধ্যমে অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর ব্যথা ও অস্বস্তি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। ফলে চিকিৎসকরা দীর্ঘ ও জটিল অস্ত্রোপচারও তুলনামূলকভাবে স্বাচ্ছন্দ্যে করতে পারেন। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বিভিন্ন ধরনের সূক্ষ্ম ও উন্নত অস্ত্রোপচার যন্ত্র তৈরি হয়েছে। এসব যন্ত্র ব্যবহার করে চিকিৎসকরা শরীরের নির্দিষ্ট স্থানে অত্যন্ত নিখুতভাবে কাজ করতে পারেন। এতে অতিরিক্ত রক্তপাত ও আশপাশের টিস্যুর ক্ষতি কমানো সম্ভব হয়। বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছেন যে জীবাণুর সংক্রমণ অস্ত্রোপচারের পর মারাত্মক জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। আধুনিক হাসপাতালে অস্ত্রোপচার কক্ষ, যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম জীবাণুমুক্ত করার ব্যবস্থা থাকে। ফলে অস্ত্রোপচারের পর সংক্রমণের ঝুকি কমে। বিজ্ঞানের অগ্রগতির কারণে বর্তমানে হৃদযন্ত্রের বিভিন্ন জটিল রোগের অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হচ্ছে। হার্টের ভালভের সমস্যা, জন্মগত হৃদরোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে আধুনিক অস্ত্রোপচার পদ্ধতি মানুষের জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ক্যান্সারের চিকিৎসায়ও অস্ত্রোপচার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিজ্ঞানীরা উন্নত পরীক্ষা ও ইমেজিং প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক ক্ষেত্রে রোগাক্রান্ত টিস্যু শনাক্ত করতে পারেন। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তা অপসারণ করা হয়। আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থা অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর হৃদস্পন্দন, রক্তচাপ, অক্সিজেনের মাত্রা ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণে সাহায্য করে। ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক প্রযুক্তি, উন্নত ইমেজিং, থ্রিডি মডেলিং ও অন্যান্য প্রযুক্তির ব্যবহার অস্ত্রোপচারকে আরও নির্ভুল ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক করতে পারে।
এক্স রে প্রযুক্তিতে বিজ্ঞানের অবদান
এক্স রে প্রযুক্তি আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কার। মানবদেহের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ হাড় ও টিস্যুর অবস্থা বাহিরে থেকে না কেটেই দেখার সুযোগ তৈরি করেছে এই প্রযুক্তি। বিশেষ করে হাড় ভাঙ্গা, বুকের রোগ, দাতের সমস্যা এবং বিভিন্ন আঘাত পরীক্ষা করার জন্য এক্সরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এক্সরে হলো এক ধরনের উচ্চ শক্তির তড়িৎচুম্বকীয় বিকিরণ, যা শরীরের বিভিন্ন টিস্যুর মধ্য দিয়ে ভিন্ন মাত্রায় প্রবেশ করতে পারে। শরীরের ঘন অংশ যেমন হাড় এক্সরে বেশি শোষণ করে, তাই ছবিতে হাড় সাধারণত সাদা দেখা যায়। তুলনামূলক কম ঘন টিস্যু ও বায়ু ভিন্নভাবে দেখা যায়। এভাবেই শরীরের ভেতরের গঠন সম্পর্কে চিকিৎসক ধারণা পান। এক্সরের সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহার হলো হাড়ের সমস্যা শনাক্ত করা। দুর্ঘটনায় হাড় ভেঙ্গে গেলে বা ফাটল ধরলে এক্সরে করে তার অবস্থান সম্পর্কে চিকিৎসক ধারণা পান। এর সাহায্যে হাড় সঠিকভাবে বসেছে কি না চিকিৎসার পর হাড়ের অবস্থা কেমন এসবও দেখা যায়। ডেন্টাল এক্সরে দাতের চিকিৎসায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দাতের ভেতরের অংশ, দাতের শিকড় এবং চোয়ালের হাড়ের অবস্থা সম্পর্কে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারেন। বাইরে থেকে দেখা যায় না এমন কিছু সমস্যা সমাধান করতে এটিও সহায়ক। প্রথম দিকে এক্সরে ছবি তৈরি করতে বিশেষ ফিল্ম ব্যবহার করা হতো। বর্তমানে ডিজিটাল এক্সরে প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে ছবি দ্রুত তৈরি করা যায়। এক্সরে আয়নাইজিং বিকিরণ ব্যবহার করে। অপ্রয়োজনে বারবার এক্সরে করা উচিত নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনের সময়ই পরীক্ষা করা উচিত। হাসপাতাল ও চিকিৎসাকেন্দ্রে রোগী ও কর্মীদের বিকিরণ থেকে সুরক্ষার জন্য নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়। এক্সরে প্রযুক্তি চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে। আধুনিক রোগ নির্ণয় ব্যবস্থায় এক্সরে প্রযুক্তির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিসীম।
জরুরী চিকিৎসায় বিজ্ঞানের অবদান
জরুরি
চিকিৎসা হলো দুর্ঘটনা, আকস্মিক
অসুস্থতা বা জীবন সংকটপূর্ণ অবস্থায়
দ্রুত রোগীকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়ার ব্যবস্থা। কোনো রোগি হঠাৎ গুরুত্বর
অসুস্থ হলে দ্রুত চিকিৎসা
না ফেলে তার জীবন ঝুকির
মধ্যে পড়তে পারে। তাই
জরুরি চিকিৎসার প্রধান উদ্দেশ্য হলো রোগির জীবন
রক্ষা করা, অবস্থা আরও
খারাপ হওয়া ঠেকানো এবং
দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা
শুরু করা। জরুরি চিকিৎসা
আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার একটি অপরিহার্য অংশ।
সংকটময় মুহূর্তে দ্রুত ও সঠিক চিকিৎসা
অনেক মানুষের জীবন বাচাতে পারে।
উন্নত জরুরি বিভাগ, প্রশিক্ষিত চিকিৎসাকর্মী, অ্যাম্বুলেন্স এবং সাধারণ মানুষের
প্রাথমিক চিকিৎসা সম্পর্কে জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।
আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে বিজ্ঞানের অবদান
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও বহুল ব্যবহৃত রোগ নির্ণয় পদ্ধতি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে মানুষের শরীরের ভিতরের বিভিন্ন অঙ্গের অবস্থা কোনো ধরনের অস্ত্রোপচার ছাড়াই দেখা সম্ভব হয়েছে। বিশেষ করে গর্ভাবস্থায় শিশুর বৃদ্ধি ও অবস্থান পর্যবেক্ষণ, পেটের বিভিন্ন অঙ্গ পরীক্ষা, কিডনি, লিভার, পিত্তথলি, থাইরয়েডসহ নানা অঙ্গের সমস্যা শনাক্ত করতে আল্ট্রাসনোগ্রাফি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে উচ্চ কম্পাঙ্কের শব্দতরঙ্গ ব্যবহার করা হয়। একটি বিশেষ যন্ত্র শরীরের ভেতরে শব্দতরঙ্গ পাঠায়। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ ও টিস্যু থেকে প্রতিফলিত শব্দতরঙ্গ আবার যন্ত্রে ফিরে আসে। কম্পিউটার সেই সংকেত বিশেষ করে শরীরের ভেতরের ছবি তৈরি করে। ফলে চিকিৎসক শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গের গঠন ও অবস্থার বিষয়ে ধারণা লাভ করতে পারেন। আল্ট্রাসনোগ্রাফির সবচেয়ে পরিচিত ব্যবহারগুলোর একটি হলো গর্ভাবস্থায় ভ্রূণ দেখা। এর মাধ্যমে গর্ভের শিশুর অবস্থান, বৃদ্ধি ও বিকাশ সম্পর্কে চিকিৎসক প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারেন। গর্ভাবস্থার বিভিন্ন সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী আল্ট্রাসাউন্ড পরীক্ষা করা হতে পারে। কিডনিতে পাথর, পিত্তথলিতে পাথরসহ কিছু সমস্যার জন্য আল্ট্রাসনোগ্রাফি চিকিৎসকদের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিতে পারে। রোগের অবস্থান ও প্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার পর চিকিৎসক প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে পারেন। আল্ট্রাসনোগ্রাফি সাধারণত প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শে বিভিন্ন রোগ পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষাটি সাধারণত বাহির থেকে করা হয় এতে বড় ধরনের কাটাছেড়ার প্রযোজন হয় না। বর্তমানে আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রযুক্তি আগের তুলনায় অনেক উন্নত হয়েছে। উন্নত যন্ত্রের মাধ্যমে আরও পরিষ্কার ছবি পাওয়া যায়। থ্রিডি ও ফোরডি আল্ট্রাসাউন্ড কিছু নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে শরীরের গঠনকে আরও বিস্তারিতভাবে দেখার সুযোগ দিতে পারে। রোগ নির্ণয়কে আধুনিক করার ক্ষেত্রে আল্ট্রাসনোগ্রাফি প্রযুক্তির অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সিটিস্ক্যান ও এমআরআই আধুনিক রোগ নির্ণয়ে বিজ্ঞানের অবদান
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে সিটিস্ক্যান ও এমআরআই রোগ নির্ণয়ের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি। মানুষের শরীরের ভেতরের বিভিন্ন অঙ্গ প্রতঙ্গ সরাসরি না কেটে বা অস্ত্রোপচার না করেই বিস্তারিতভাবে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে এসব প্রযুক্তি। সিটিস্ক্যান হলো এক ধরনের উন্নত এক্সরে প্রযুক্তি। শরীরের বিভিন্ন অংশের অসংখ্য এক্সরে ছবি সংগ্রহ করে কম্পিউটারের সাহায্যে শরীরের ভেতরের আড়াআড়ি ও স্তরভিত্তিক ছবি তৈরি করা হয়। মাথায় আঘাত, মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ, স্ট্রোক, টিউমার, ফুসফুসের রোগ, হাড়ের সমস্যা, পেটের বিভিন্ন রোগ শনাক্ত করতে সিটিস্ক্যান অনেকভাবে ব্যবহার করা হয়। এমআরআই একটি শক্তিশালী চৌস্বক ক্ষেত্র ও রেডিও তরঙ্গ ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের অত্যন্ত বিস্তারিত ছবি তৈরি করে। সিটিস্ক্যানের মতো এতে এক্সরে রশ্মি ব্যবহার করা হয় না। মস্তিষ্কের টিউমার, স্ট্রোকের বিভিন্ন অবস্থা, মেরুদন্ডের সমস্যা, ডিস্কের সমস্যা, জয়েন্টের আঘাত, লিগমেন্ড ছিড়ে যাওয়া এবং বিভিন্ন নরম টিস্যুর অস্বাভাবিকতা শনাক্ত করতে এমআরআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সিটিস্ক্যান ও এমআরআই চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয়ে দ্রুততা ও নির্ভুলতা প্রদান করে। আগে যেসব রোগ শনাক্ত করতে অনেক সময় অনুসন্ধানমূলক অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন হতো বর্তমানে উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই অস্ত্রোপচার ছাড়াই রোগ সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। ফলে রোগির চিকিৎসা দ্রুত শুরু করা যায় এবং অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় চিকিৎসা বা অস্ত্রোপচার এড়ানো সম্ভব হয়। সিটিস্ক্যান ও এমআরআই দুটি প্রযুক্তির ব্যবহার এক নয়। হাড় ও জরুরি পরিস্থিতে সিটিস্ক্যান খুব কার্যকর আর মস্তিষ্ক, মেরুদন্ড ও নরম টিস্যুর সূক্ষ্ম সমস্যা দেখতে এমআরআই বিশেষভাবে উপযোগি। কোন পরীক্ষার প্রয়োজন হবে তা রোগীর উপসর্গ ও চিকিৎসকের পরামর্শের ওপর নির্ভর করে। সিটিস্ক্যান ও এমআরআই চিকিৎসাক্ষেত্রে বিজ্ঞানের অসাধারণ সাফল্যের উদাহরণ।
টেলিমেডিসিনে বিজ্ঞানের অবদান
আধুনিক বিজ্ঞানও তথ্যপ্রযুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো টেলিমেডিসিন। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে রোগি ও চিকিৎসক একই স্থানে উপস্থিত না থেকেও মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও ভিডিও যোগাযোগের সাহায্যে চিকিৎসা সেবা প্রদান ও গ্রহণ করতে পারেন। বিশেষ করে গ্রাম, চরাঞ্চল, পাহাড়ি এলাকা কিংবা যেখানে উন্নত চিকিৎসার অভাব রয়েছে । সেখানে টেলিমেডিসিন চিকিৎসাসেবা পৌছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে রোগী ঘরে বসেই চিকিৎসকের সাথে ভিডিও ও অডিও কল বা অনলাইন যোগাযোগের মাধ্যমে পরামর্শ নিতে পারেন। রোগীর উপসর্গ, পূর্বের রিপোর্ট ও প্রয়োজনীয় তথ্য চিকিৎসকের কাছে পাঠানো যায়। চিকিৎসক এসব তথ্য আলোচনা করে প্রাথমিক পরামর্শ দিতে পারেন। প্রয়োজন হলে পরীক্ষা নিরীক্ষা বা সরাসরি হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দিতে পারেন। বাংলাদেশের অনেক অঞ্চলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। ফলে অনেক মানুষকে চিকিৎসার জন্য দূরের শহরে যেতে হয়। টেলিমেডিসিনের মাধ্যমে দূরবর্তী এলাকার মানুষ শহরের অভিজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ পাওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। আধুনিক টেলিমেডিসিন ব্যবস্থায় রোগীর বিভিন্ন রিপোর্ট, প্রেসক্রিপশন ও চিকিৎসার ইতিহাস ডিজিটালভাবে সংরক্ষণ ও আদান প্রদান করা সম্ভব। এতে চিকিৎসক রোগির আগের তথ্য দেখে পরবর্তী চিকিৎসা পরিকল্পনা করতে পারেন। টেলিমেডিসিনের অনেক সুবিধা থাকলেও কিছু সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। ইন্টারনেট সংযোগ দুর্বল হলে সেবা ব্যাহত হতে পারে। অনেক রোগের ক্ষেত্রে সরাসরি শারীরিক পরীক্ষা, রক্ত পরীক্ষা ও অন্যান্য পরীক্ষা নিরীক্ষা প্রয়োজন হয় যা অনলাইনে করা সম্ভব নয়। এছাড়া রোগির ব্যক্তিগত ও চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্যের গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতে উন্নত ইন্টারনেট, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ডিজিটাল স্বাস্থ্যব্যবস্থা ও আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির সমন্বয়ে টেলিমেডিসিন আরও উন্নত ও কার্যকর হবে।
রোবটিক সার্জারিতে বিজ্ঞানের অবদান
রোবটি ক সার্জারি হলো আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি অত্যাধুনিক অস্ত্রোপচার পদ্ধতি। যেখানে বিশেষভাবে তৈরি রোবটিক যন্ত্র ও কম্পিউটার প্রযুক্তির সাহায্যে চিকিৎসক অত্যন্ত সূক্ষ্ম ও নিখুতভাবে অস্ত্রোপচার করেন। এখানে রোবট নিজে থেকে চিকিৎসা করে না। একজন প্রশিক্ষিত সার্জন কনসোলের মাধ্যমে রোবটিক যন্ত্রগুলো নিয়ন্ত্রণ করেন। ফলে মানুষের হাতের স্বভাবিক নড়াচড়ার তুলনায় অনেক বেশি সূক্ষ্মভাবে শরীরের নির্দিষ্ট অংশে অস্ত্রোপচার করা সম্ভব হয়। রোবটিক সার্জারিতে সাধারণত রোগির শরীরে ছোট ছোট ছিদ্র করে বিশেষ অস্ত্রোপচার যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়। যন্ত্রগুলোর সাথে ক্যামেরা ও ক্ষুদ্র সার্জিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট যুক্ত থাকে। সার্জন একটি নিয়ন্ত্রণ কনসোলে বসে উচ্চ রেজোলিউশনের ত্রিমাত্রিক ছবি দেখে যন্ত্রগুলো পরিচালনা করেন। সার্জনের হাতের নড়াচড়া কম্পিউটার প্রযুক্তির মাধ্যমে রোবটিক যন্ত্রের অত্যন্ত সূক্ষ্ম নড়াচড়ায় রূপান্তরিত হয়। রোবটিক যন্ত্রের সূক্ষ্ম ও নিয়ন্ত্রিত নড়াচড়ার কারণে জটিল অস্ত্রোপচারও অত্যন্ত নির্ভুলভাবে করা যায়। অনেক ক্ষেত্রে প্রচলিত বড় কাটার পরিবর্তে ছোট ছিদ্রের মাধ্যমে অস্ত্রোপচার করা হয়। এতে শরীরে ক্ষত তুলনামূলতভাবে কম হয়। ক্ষুদ্র ও নিয়ন্ত্রিত কাটার কারণে কিছু ধরনের অস্ত্রোপচারে রক্তপাত কমানোর সুবিধা পাওয়া যায়। ছোট ক্ষত হওয়ায় অস্ত্রোপচারের পর ব্যথা ও অস্বস্তি অনেক ক্ষেত্রে কম হতে পারে। রোবটিক সার্জারি বিভিন্ন ধরনের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে। মূত্রনালি ও প্রোস্টেটের অস্ত্রোপচার, স্ত্রীরোগ সংক্রান্ত অস্ত্রোপচার, কিছু হৃদযন্ত্রের অস্ত্রোপচার এবং বিভিন্ন ধরনের ক্যান্সার সার্জারি। বাংলাদেশে চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ভবিষ্যতে রোবটিক সার্জারির প্রসার ঘটলে জটিল অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে নতুন সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। এজন্য চিকিৎসকদের বিশেষ প্রশিক্ষণ, উন্নত হাসপাতাল অবকাঠামো, আধুনিক যন্ত্রপাতি এবং দক্ষ প্রযুক্তিবিদ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সাথে এই প্রযুক্তি যেন সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে আসে সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
কৃত্রিম অঙ্গ ও অঙ্গ প্রতিস্থাপনে বিজ্ঞানের অবদান
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের অন্যতম বিস্ময়কর অর্জন হলো কৃত্রিম অঙ্গ তৈরি এবং অঙ্গ প্রতিস্থাপন। দুর্ঘটনা, জন্মগত ত্রুটি, রোগ বা অন্য কোনো কারণে শরীরের কোনো অঙ্গ নষ্ট হলে মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতির ফলে বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত বা হারানো অঙ্গের বিকল্প হিসেবে কৃত্রিম অঙ্গ ব্যবহার করা যায়। প্রয়োজন অনুযায়ী অন্য মানুষের সুস্থ অঙ্গ রোগীর শরীরে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হচ্ছে। কৃত্রিম অঙ্গ হলো এমন একটি বিশেষভাবে তৈরি যন্ত্র, যা শরীরের হারানো অঙ্গের কিছু কাজ সম্পাদনে সহায়তা করে। হাত, পা, আঙুলসহ বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম অঙ্গ বর্তমানে তৈরি করা হয়। আধুনিক কৃত্রিম অঙ্গ হালকা, শক্তিশালী ও আরামদায়ক উপকরণ দিয়ে তৈরি করা যায়। কৃত্রিম অঙ্গের উন্নতির ফলে দুর্ঘটনায় হাত, পা হারানো মানুষ আবার হাটা, চলাফেরা, বিভিন্ন কাজ করা এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। অঙ্গ প্রতিস্থাপন হলো কোনো রোগির নষ্ট অঙ্গের পরিবর্তে একজন দাতার সুস্থ অঙ্গ বা টিস্যু অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে রোগির শরীরে স্থাপন করা। আধুনিক চিকিৎসায় কিডনি, লিভার, হৃদযন্ত্র, ফুসফুস এবং অগ্নাশয়সহ বিভিন্ন অঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে অঙ্গ প্রতিস্থাপনের সফলতা অনেক বেড়েছে। কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ফলে হারানো অঙ্গের কিছু কার্যক্ষমতা ফিরিয়ে আনা যায়। রোগির চলাফেরা ও দৈনন্দিন কাজ সহজ হয়। রোগির আত্মবিশ্বাস ও সামাজিকভাবে স্বাভাবিক জীবনযাপনের সুযোগ বাড়ছে। অনেক রোগি দীর্ঘদিনের কষ্ট থেকে মুক্ত হয়ে নতুনভাবে জীবন শুরু করার সুযোগ পান। একদিকে কৃত্রিম অঙ্গ হারানো মানুষের চলাফেরা ও কাজের সক্ষমতা বাড়ছে এবং অন্যদিকে অঙ্গ প্রতিস্থাপন গুরুতর রোগে আক্রান্ত মানুষের জীবন বাচানোর সুযোগ তৈরি করছে। ভবিষ্যতে উন্নত চিকিৎসার ফলে মানবদেহের ক্ষতিগ্রস্তঅঙ্গ প্রতিস্থাপন ও পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে আরও বড় সাফল্য আসতে পারে।
মানুষের আয়ু বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানের অবদান
মানুষের
সভ্যতার অগ্রগতির সাথে সাথে বিজ্ঞানের
উন্নতি মানুষের জীবনযাত্রায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। একসময় সামান্য জ্বর, সংক্রমণ বা আঘাতেও মানুষের
মুত্যু হতো। শিশু মৃত্যু
ছিল বেশি এবং মানুষের
গড় আয়ুও ছিল তুলনামূলকভাবে
কম। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের
অগ্রগতির ফলে বর্তমানে মানুষ
অনেক রোগ থেকে সুরক্ষা
পাচ্ছে এবং আগের তুলনায়
দীর্ঘ ও সুস্থ জীবনযাপন
করতে পারছেন। বিজ্ঞান আধুনিক রোগ নির্ণয়ের নানা
পদ্ধতি আবিষ্কার করেছে। এক্সরে, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, সিটি স্যান, এমআরআই,
ইসিজি ও বিভিন্ন রক্ত
পরীক্ষার মাধ্যমে রোগ দ্রুত শনাক্ত
করা হচ্ছে। গর্ভকালিন পরীক্ষা, নিরাপদ, প্রসব, সিজারিয়ান অপারেশন, নবজাতকের নিবির পরিচর্যা এবং বিভিন্ন টিকার
কারণে মা ও শিশুর
মৃত্যুহার কমেছে। এর ফলে মানুষের
গড় আয়ু বৃদ্ধিতেও গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা রেখেছে। বিজ্ঞান খাদ্যের পুষ্টিগুণ সম্পর্কে মানুষের জ্ঞান বৃদ্ধি করেছে। খাদ্য সংরক্ষণ, বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, নিরাপদ
খাদ্য উৎপাদন ও পুষ্টিকর খাদ্য
গ্রহণের মাধ্যমে অপুষ্টি ও খাদ্যবাহিত রোগ
কমানো সম্ভব হচ্ছে। বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশের
উন্নয়ন সংক্রামক রোগ প্রতিরোধে অত্যন্ত
গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞানসম্মত পানি বিশুদ্ধকরণ ও
স্যানিটেশন ব্যবস্থার ফলে ডায়রিয়া, কলেরা
এবং অন্যান্য পানিবাহিতরোগের প্রকোপ কমেছে। বিজ্ঞান শুধু রোগের চিকিৎসা
নয় রোগ প্রতিরোধের পথও
দেখিয়েছে। স্বাস্থ্যবিধি, হাত ধোয়া, টিকাদান,
রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ এবং জনসচেতনতার মাধ্যমে
মানুষের সুস্থ্য জীবনযাপনের সুযোগ বেড়েছে। টেলিমেডিসিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবটিক প্রযুক্তি ও ডিজিটাল স্বাস্থ্যসেবার
মাধ্যমে দ্রুত চিকিৎসা পরামর্শ ও রোগ নির্ণয়
সম্ভব হচ্ছে। মানুষের আয়ুর পেছনে বিজ্ঞানের
অবদান অপরিসীম। রোগ নির্ণয়, টিকা,
ওষুধ, অস্ত্রোপচার, অঙ্গ প্রতিস্থাপন, পুষ্টি,
বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন এবং আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির
উন্নতি মানুষের মৃত্যুঝুকি কমিয়ে দিয়েছে। তবে শুধু দীর্ঘ
জীবন নয় সুস্থ ও
মানসম্মত জীবননিশ্চিত করাও জরুরি।
চিকিৎসা গবেষণায় বিজ্ঞানের অবদান
চিকিৎসা গবেষণায় বিজ্ঞানের অবদান অপরিসীম। মানুষের রোগ, রোগের কারণ, প্রতিরোধ, নির্ণয় এবং চিকিৎসার কার্যকর পদ্ধতি আবিষ্কারের পেছনে বিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। একসময় যেসব রোগকে দুরারোগ্য বা প্রাণঘাতী মনে করা হতো। আধুনিক চিকিৎসার ফলে সেসব রোগের অনেকগুলোর চিকিৎসা ও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়েছে। বিজ্ঞানের মাধ্যমে বিভিন্ন রোগের জীবাণু, জেনেটিক কারণ ও পরিবেশগত ঝুকি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। চিকিৎসা গবেষণায় বিজ্ঞানের অন্যতম বড় অবদান হলো নতুন ওষুধ আবিষ্কার। গবেষণার মাধ্যমে কোনো রোগের জন্য কার্যকর রাসায়নিক উপাদান শনাক্ত করা হয় এবং বিভিন্ন পরীক্ষার মাধ্যমে তার নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। এর ফলে ক্যান্সার, হৃদরোগ, সংক্রমণসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় নতুন নতুন ওষুধ তৈরি হচ্ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে বিভিন্ন সংক্রামক রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর টিকা আবিষ্কার হয়েছে। জিন ও বংশগত বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। কিছু রোগ যে জিনগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত তা গবেষণার মাধ্যমে শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে। ক্যান্সারের বিভিন্ন ধরন, কোষের অস্বাভাবিক এবং রোগ ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া নিয়ে বিজ্ঞানীরা অনেক গবেষণা করেছেন। এর ফলে ক্যান্সার শনাক্তকরণ, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি, লক্ষ্যভিত্তিক চিকিৎসা এবং রোগীর জন্য উপযোগী চিকিৎসা পদ্ধতির উন্নতি হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসা গবেষণায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও মেশিন লার্নিংয়ের ব্যবহার বাড়ছে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলে রোবটিক সার্জারি ও উন্নত অস্ত্রোপচার প্রযুক্তির বিকাশ ঘটেছে। অঙ্গ প্রতিস্থাপন, কৃত্রিম অঙ্গ এবং টিস্যু প্রকৌশল নিয়ে গবেষণা চিকিৎসাক্ষেত্রে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। একই রোগে আক্রান্ত সব মানুষের জন্য একই চিকিৎসা সমানভাবে কার্যকর নাও হতে পারে। ভবিষ্যতে গবেষণা আরও এগিয়ে গেলে অনেক জটিল ও দুরারোগ্য রোগের চিকিৎসা আবিষ্কৃত হবে বলে আশা করা যায়।
চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিজ্ঞানে অবদান মানবসভ্যতার ইতিহাসে এক অনন্য আশীর্বাদ। বিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে চিকিৎসাব্যবস্থা আজ আগের তুলনায় অনেক বেশি নিরাপদ ও নির্ভুল হয়েছে। একসময় যে রোগগুলোকে ভয়াবহ ও মৃত্যুর কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো বর্তমানে সেসব রোগের অনেকগুলোর প্রতিরোধ ও চিকিৎসা সম্ভব হচ্ছে। ওষুধ ও টিকা আবিষ্কার, এক্সরে, সিটি স্ক্যান, এমআরআই, আল্ট্রাসনোগ্রাফি, রোবটিক সার্জারি, কৃত্রিম অঙ্গ প্রতিস্থাপন, টেলিমেডিসিন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার চিকিৎসাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে। বিজ্ঞান শুধু রোগ নিরাময়ের পথই তৈরি করেনি বরং রোগ প্রতিরোধ ও আগাম শনাক্তকরণের সুযোগও সৃষ্টি করেছে। চিকিৎসা গবেষণার মাধ্যমে প্রতিনিয়ত নতুন রোগের কারণ অনুসন্ধান, নতুন ওষুধ উদ্ভাবন এবং উন্নত চিকিৎসা পদ্ধতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। ফলে মানুষের গড় আয়ু বৃদ্ধি পেয়েছে। ভবিষ্যতে জেনেটিক গবেষণা, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আধুনিক প্রযুক্তির আরও উন্নতির মাধ্যমে চিকিৎসাবিজ্ঞান মানবজীবনকে আরও সুস্থ করে তুলবে। মানবকল্যাণে বিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানগুলোর একটি হলো আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের বিকাশ।বিজ্ঞানের সঠিক ও মানবিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে চিকিৎসাক্ষেত্রে আরও বড় সাফল্য অর্জন করা সম্ভব হবে।